মেসির বিবর্তন: ড্যাজলিং উইঙ্গার থেকে ‘হেঁটে চলা’ জাদুকর

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-০৮, | ২২:৩২:৩৩ |

২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে যদি আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বসেরার মুকুট ধরে রাখতে হয়, তবে তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন একজনই লিওনেল মেসি। আর মাত্র কয়েকটা দিন পরেই ৩৮ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি পা রাখতে যাচ্ছেন তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপে, যা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও গুইলার্মো ওচোয়ার সাথে যৌথভাবে একটি অনন্য বিশ্বরেকর্ড। তবে ২০০৩ সালে বার্সেলোনার জার্সিতে অভিষেক হওয়া সেই চপল কিশোর আর আজকের মেসির মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। সময়ের নিয়মে সাধারণ ফুটবলারদের যেখানে পতন ঘটে, সেখানে মেসি নিজেকে বারবার ভেঙে গড়েছেন কেবল ফুটবল দুনিয়াকে শাসন করার জন্য।

হোসে মরিনহোর পোর্তোর বিপক্ষে মাত্র ১৬ বছর বয়সে যখন বার্সার হয়ে এক প্রীতি ম্যাচে মাঠে নেমেছিলেন মেসি, তখন তিনি ছিলেন শুধুই একজন ডানপ্রান্তের উইঙ্গার, যার মূল অস্ত্র ছিল গতি আর ড্রিবলিং। সেই থেকে আজ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা এবং ইন্টার মায়ামির জার্সিতে অন্তত পাঁচবার নিজের খেলার ধরন বদলেছেন এলএমটেন। একটা সময় যখন বার্সার সেরা তারকা রোনালদিনহো প্রথমবার এই তরুণকে অনুশীলনে দেখেছিলেন, তখনই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে এই ছেলেই একদিন পৃথিবীর সেরা হবে। এর দুই বছর পর জুভেন্টাসের বিপক্ষে এক ম্যাচে তরুণ মেসির পারফরম্যান্স দেখে এতটাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন কোচ ফাবিও ক্যাপেলো যে, তিনি তাৎক্ষণিকভাবেই মেসিকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।

মেসির বয়স যখন ২১, তখন বার্সেলোনার দায়িত্ব নেন পেপ গার্দিওলা। প্রথম দিকে মেসির আক্রমণভাগের ডানপ্রান্তই ছিল গোল করার নিজস্ব মহাসড়ক। কিন্তু গার্দিওলা দ্রুতই বুঝতে পেরেছিলেন, মেসিকে কেবল উইংয়ে আটকে রাখা মানে তার প্রতিভাকে সীমিত করে ফেলা। রক্ষণাত্মক কিছু কৌশলের কারণে মেসিকে উইং থেকে সরিয়ে মাঠের মাঝখানে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন গার্দিওলা, যাতে দলের খেলাটাই আবর্তিত হয় তাকে কেন্দ্র করে। আর এই কৌশলগত পরিবর্তনের হাত ধরেই জন্ম নেয় বিশ্ব ফুটবলের এক নতুন ইতিহাস।

২০০৯ সালের মে মাসে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে গার্দিওলা এক অবিশ্বাস্য চাল চালেন। মেসিকে ডান উইং থেকে সরিয়ে প্রথাগত স্ট্রাইকারের জায়গায় নিয়ে আসা হলো, কিন্তু তার ভূমিকা স্ট্রাইকারের মতো ছিল না। তিনি নিচে নেমে আসছিলেন, বল রিসিভ করছিলেন এবং সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন; যা ফুটবল ইতিহাসে ‘ফলস নাইন’ (ছদ্ম স্ট্রাইকার) হিসেবে পুনর্জন্ম পায়। সে ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদকে ৬-২ গোলে বিধ্বস্ত করার পর ফুটবলবিশ্ব এক নতুন মেসিকে আবিষ্কার করে, যার কোনো সমাধান প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের জানা ছিল না।

২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে মেসি স্প্যানিশ লা লিগায় ৬৯ ম্যাচে অবিশ্বাস্য ৯৬টি গোল করেছিলেন। এই গোলবন্যার ফলস্বরূপ ব্যালন ডি'অর যেন তার স্থায়ী সম্পত্তি হয়ে উঠেছিল। তবে ২০১৫ সালে জাভি এবং এর তিন বছর পর ইনিয়েস্তা যখন বার্সেলোনা ছাড়লেন, তখন মেসির কাঁধে এক নতুন দায়িত্ব এসে পড়ে। এতকাল যে মাঝমাঠ ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা, সেটি হারিয়ে যাওয়ায় মেসিকে একই সাথে জাভি, ইনিয়েস্তা এবং মূল গোলদাতার ভূমিকা পালন করতে হচ্ছিল। এই অতিমানবীয় চাপ সামলাতে মেসি নিজেকে রূপান্তর করলেন এক অনন্য ‘প্লে-মেকার’ বা 'এনগাঞ্চে' হিসেবে, যেখানে গোল করার চেয়ে গোল করানোর কারিগর হয়ে উঠলেন তিনি।

ক্লাব ফুটবলের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির অধিনায়কত্বের যাত্রাটা ছিল চরম নাটকীয়তায় ভরা। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল এবং পর পর দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের বেদনা তাকে এতটাই বিপর্যস্ত করেছিল যে, তিনি অবসরের সিদ্ধান্তও নিয়ে নিয়েছিলেন। তবে ফিরে আসার পর এক নতুন এবং আক্রমণাত্মক নেতার দেখা মেলে, যিনি দলের প্রয়োজনে মাঠের ভেতরে ও বাইরে সমানভাবে গর্জে উঠতে পারেন। ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয় ছিল তার সেই মানসিক মুক্তির মুহূর্ত, যা পরবর্তীতে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে এক মহাকাব্যিক রূপ ধারণ করে।

কাতার বিশ্বকাপে ভক্তরা এক পূর্ণাঙ্গ মেসিকে দেখেছিল, যেখানে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে ইওস্কো গাভার্দিওলকে পরাস্ত করার মুহূর্তে যেমন ২০০৯ সালের সেই চপল উইঙ্গারের দেখা মিলেছিল, তেমনই পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে তিনি ছিলেন একজন নিখুঁত কোয়ার্টার ব্যাক (সুনিপুণ পরিকল্পনাকারী)। আধুনিক ফুটবলের শারীরিক ও কৌশলগত পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে মেসি নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যেখানে পেশিশক্তি নয়, বরং মস্তিস্কই প্রধান অস্ত্র।

বর্তমানে ইন্টার মায়ামি কিংবা সাম্প্রতিক কোপা আমেরিকার ম্যাচগুলোতে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মেসি এখন মাঠ জুড়ে দৌড়ানোর চেয়ে হেঁটে চলেন বেশি। সমালোচকরা একসময় এটিকে অলসতা বললেও, ফুটবল বিশেষজ্ঞরা এখন একে দেখছেন খেলাটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখার এক জাদুকরী কৌশল হিসেবে। তিনি মূলত শক্তি সঞ্চয় করেন এবং ম্যাচের সেই বিশেষ মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করেন যা এক নিমেষে খেলার ভাগ্য বদলে দিতে পারে। দীর্ঘ দুই দশকের ক্যারিয়ারে মেসি কতগুলো ট্রফি বা গোল পেয়েছেন, তার চেয়েও বড় সত্য হলো ফুটবলের গতিপ্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে তিনি কতবার নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন এবং প্রতিবারই বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।

সূত্র: বিবিসি

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..