ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নয়া দিল্লিতে একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় ভারত সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, "শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ কেন দিল- এটি আমাদের প্রশ্ন।"
চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। সে প্রসঙ্গ টেনে সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ভারত তাকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সেখানে আশ্রয়ে থেকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন; তাকে সরাসরি গণমাধ্যমে কথা বলা সুযোগ দেওয়া হল।"
তিনি বলেন, বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ড নিয়ে ভারতে থাকা শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার কেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর এই সুযোগ দিল, সেটাও সরকারের প্রশ্ন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে বুধবার নয়াদিল্লিতে সাউথ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। তিনি সেখানে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন।
তাকে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে।
বিবিসি বাংলা লিখেছে, জুলাই আন্দোলনের সময়ের হত্যাকাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা চাইবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান শেখ হাসিনা।
ওই সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকা তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে একপক্ষকে ইনডেমনিটি বা ‘দায়মুক্তি’ দেওয়া হয়েছে; একপক্ষ দায়মুক্তি পেলে অন্যপক্ষেরও সে অধিকার আছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেকে উদ্ধৃত করে বিবিসি বাংলা লিখেছে, "জুলাই আন্দোলনে তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) গণহত্যা চালিয়েছে। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেনি বা ক্ষমা চায়নি। এমনকি তাদের কোনো অনুশোচনা নেই।
"বরং তারা ভারতে আশ্রয় নিয়ে থেকে বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালাচ্ছে। জনগণ তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ।"
বিগত অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল। নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর তা বাহল রেখেছে।
বিবিসি বাংলা লিখেছে, নয়া দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা তাদের দলের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, "দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির ব্যাপারে বিচার হবে। সংশ্লিষ্ট আইনে সেই বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
"বিএনপি নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে চায় না। কিন্তু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের বিষয়। তারা তো (আওয়ামী লীগ) আদালতে যায়নি। আদালত থেকেই যে সিদ্ধান্ত আসবে, সেভাবেই সরকার কাজ করবে।”
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "জনগণও বিচার করবে। জুলাই আন্দোলনে তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) গণহত্যা চালিয়েছে। তাদের দীর্ঘ শাসনে বিরোধী দল ও মতের মানষকে দমন-পীড়ণ চালিয়েছে; গুম, খুন করেছে। ফলে তাদের প্রতি জনগণের কোনো আস্থা নেই এবং তাদের ব্যাপারে জনগণও বিচার করবে।"
এদিকে দিল্লির সংবাদ সম্মেলনের আগে গত মঙ্গলবার আদালতের নির্দেশনা তুলে ধরে বাংলাদেশ সরকারের এক তথ্য বিবরণীতে শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রচার না করতে অনুরোধ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে 'আইনগত ব্যবস্থা' নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
অবশ্য আদালতের আদেশের ব্যাখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “শেখ হাসিনার বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বা হেট স্পিচ আপনারা প্রচার করবেন না। বাকি বক্তব্য প্রচার করতে আইনগত বাধা কোথায়?”
তবে প্রধান কৌঁসুলির বক্তব্যের পরও সরকার তথ্য বিবরণী দিয়ে সতর্ক করায় দেশের মূল ধারার সংবাদমাধ্যম দিল্লির সংবাদ সম্মেলন বা শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে সরাসরি কোনো সংবাদ প্রকাশ করেনি।
এ জাতীয় আরো খবর..