কঠিন পথ পেরিয়ে বিশ্বকাপে যেভাবে সুযোগ পায় রেফারিরা

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-০৮, | ২২:২৬:৫৮ |

একটিমাত্র ভুল সিদ্ধান্ত গুঁড়িয়ে দিতে পারে চার বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম আর লালিত স্বপ্ন। ফুটবল বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞে শুধু খেলোয়াড়রাই নন, মাঠের অপর নায়কদেরও মুখোমুখি হতে হয় এক চরম মানসিক ও শারীরিক অগ্নিপরীক্ষার। সম্প্রতি ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য রেফারি প্যানেল চূড়ান্ত করার পর রেফারিদের জীবনের এই আলো-আঁধারির গল্প আবারও সামনে এসেছে। এবারের চূড়ান্ত তালিকায় জায়গা পেয়ে টেক্সাসের অভিজ্ঞ রেফারি ইসমাইল এলফাত যখন নিজের ঘরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন, ঠিক তখনই ইতালির মার্কো গুইদার মতো অনেক নামী রেফারিকে পুড়তে হচ্ছে বাদ পড়ার বেদনায়।

বিশ্বকাপের মঞ্চে পৌঁছানো যেকোনো রেফারির জন্য ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শিখর। তবে এই পথটি মোটেও মসৃণ নয়। ফিফার নিবিড় পর্যবেক্ষণ, কঠোর ফিটনেস পরীক্ষা এবং অবিশ্বাস্য মানসিক চাপ পেরিয়ে তবেই মেলে চূড়ান্ত টিকিট। রেফারিদের গতি, শক্তি ও চটজলদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে প্রতিনিয়ত ট্র্যাক করা হয় জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে। এমনকি তাদের ঘুমের ডেটাও চলে যায় ফিফা কর্মকর্তাদের নজরদারিতে। কনমেবল ও কনকাকাফ অঞ্চলের রেফারিদের নিয়ে আয়োজিত সাম্প্রতিক সেমিনারগুলোতেও দেখা গেছে, চরম চাপের মুখে তাদের শারীরিক প্রতিক্রিয়া কেমন হয়, তা নিরূপণ করতে স্পোর্টস সায়েন্টিস্টদের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে।

মাঠে নামার পর এই চাপ আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। রেফারিরা কেবল একটি ম্যাচ পরিচালনা করেন না, অনেক সময় তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হয় দেশগুলোর মধ্যকার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে আমেরিকা বনাম ইরানের মধ্যকার রাজনৈতিক বৈরিতা কিংবা আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের ম্যাচের তীব্র উত্তেজনা সামলানো রেফারিদের আজও মনে করিয়ে দেয় সেই মুহূর্তগুলোর কথা। যখন হাজারো দর্শক আর কোটি কোটি টিভি স্ক্রিনের চোখ আটকে থাকে একজনের বাঁশির ওপর, তখন সাধারণ একটি সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। কাতার বিশ্বকাপে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে দেওয়া পেনাল্টি কিংবা ভিনসেন্ট আবুবাকারকে লাল কার্ড দেখানোর মতো ঘটনাগুলো যেমন রেফারিদের রাতারাতি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় নিয়ে আসে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তদের ট্রোলের শিকারও হতে হয় তাদের।

সবচেয়ে নিষ্ঠুর বাস্তবতা নেমে আসে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষে। টুর্নামেন্টের ভেতরেই যেন তৈরি হয় আরেকটি টুর্নামেন্ট। যেখানে প্রতিটি ম্যাচ শেষে রেফারিদের নিজেদের মধ্যে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলে পরবর্তী পর্বের দায়িত্ব পাওয়ার জন্য। ফিফা অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্তের পরও বিতর্ক এড়াতে রেফারিদের দেশে পাঠিয়ে দেয়, যা জার্মানির ড্যানিয়েল সিবার্ট বা স্লোভেনিয়ার স্লাভকো ভিনচিচদের ক্যারিয়ারে এক বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

ফাইনালে বাঁশি বাজানোর স্বপ্ন প্রতিটি রেফারির মনেই থাকে। কিন্তু সেখানেও কাজ করে আন্তর্জাতিক নানা সমীকরণ। যেমনটা ঘটেছিল ইংলিশ রেফারি অ্যান্থনি টেইলরের ক্ষেত্রে; রাজনৈতিক ইতিহাসের কারণে ভালো পারফর্ম করা সত্ত্বেও তাকে ফাইনাল ম্যাচ পরিচালনা করতে দেওয়া হয়নি। তবে সমস্ত বাধা পেরিয়ে যারা ফাইনালের সোনালি ট্রফির পাশে দাঁড়িয়ে ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজাতে পারেন, তাদের জন্য এটি জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে। যেমনটা ২০১০ সালের ফাইনাল পরিচালনা করা সহকারী রেফারি ড্যারেন ক্যান স্মরণ করেন পরম তৃপ্তিতে। সেই সোনালি মুহূর্ত আর ম্যাচ শেষের স্বস্তির রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও শুরু হয়ে যায় পরবর্তী বিশ্বকাপের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার এক অন্তহীন লড়াই।

সূত্র: গার্ডিয়ান

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..