✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-০৮, | ২২:২৩:২৯ |বিশ্বজুড়ে যখন আরেকটি ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তেজনা তুঙ্গে, তখন আরও একবার কেবল দর্শক সারিতে বসেই টুর্নামেন্টটি পার করতে হচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনকে। অথচ এক দশক আগেও দেশটির লক্ষ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০১৬ সালে চীনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তি হওয়ার এক বিশাল মহাপরিকল্পনা উন্মোচন করেছিল। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ‘তিনটি ইচ্ছা’র মধ্যে অন্যতম ছিল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন, টুর্নামেন্টটির আয়োজন করা এবং শেষ পর্যন্ত ট্রফি জয়। সেই স্বপ্ন পূরণে দেশজুড়ে ৭০ হাজার খেলার মাঠ তৈরি এবং কোটি কোটি স্কুল শিক্ষার্থীকে ফুটবলে ভেড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এক দশক পর এসে দেখা যাচ্ছে, সেই সোনালি স্বপ্নের ফলাফল অত্যন্ত মলিন।
২০১৬ সালে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৮২ নম্বরে থাকা চীনের পুরুষ ফুটবল দলটি বর্তমানে ৯৪তম স্থানে নেমে গেছে। এমনকি এবার বিশ্বকাপের দল সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৮টি করার পরও চীন মূল পর্বে জায়গা করে নিতে পারেনি। গত বছরের জুনে ইন্দোনেশিয়ার কাছে ১-০ গোলের মর্মান্তিক পরাজয়ের পর চীনের বিশ্বকাপ মিশন পুরোপুরি ভেস্তে যায়। ২০০২ সালের আসরে কোনো গোল না করে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার ঘটনাটিই এখন পর্যন্ত দেশটির একমাত্র বিশ্বকাপ স্মৃতি হয়ে আছে। সরকারিভাবে বিশাল উদ্যোগে সংস্কৃতি গড়ে তোলার এই ব্যর্থতার পেছনে ফুটবলের চেয়ে মাঠের বাইরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশই বেশি দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শি জিনপিং যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন তার চীনা স্বপ্ন বা জাতীয় পুনর্জাগরণের ধারণার সঙ্গে ফুটবলকেও যুক্ত করা হয়েছিল। এর পরপরই চীনা সুপার লিগে (সিএসএল) বিদেশি তারকা খেলোয়াড়দের দলে ভেড়ানোর এক অন্ধ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। অস্কার, পাউলিনহো, কার্লোস তেভেজ এবং হুল্কের মতো বিশ্বখ্যাত ফুটবলারদের ইউরোপ থেকে চীনে নিয়ে আসতে শত কোটি ডলারের ঢল নামানো হয়। এই ক্লাবগুলোর পেছনে অর্থায়ন করছিল মূলত চীনের বড় বড় আবাসন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের লক্ষ্য ফুটবলের উন্নয়ন ছিল না, বরং স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে সস্তায় জমি ও ব্যাংক ঋণ হাসিল করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু এই কৃত্রিম ও লোকসানি মডেল বেশিদিন টেকেনি। করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কা এবং আবাসন খাতে সরকারের ঋণ কড়াকড়ি আইনের কারণে ক্লাবগুলোর অর্থায়ন রাতারাতি বন্ধ হয়ে যায়। ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৪০টিরও বেশি ক্লাব বিলুপ্ত হয়ে গেছে। একই সঙ্গে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, ম্যাচ ফিক্সিং এবং ঘুষের কেলেঙ্কারি দেশটির ফুটবলকে ভেতর থেকে একদম ঝাঁজরা করে দেয়।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ ফুরিয়ে যাওয়ার পর চীনের ফুটবলের ভেতরের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফুটবল বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনে কোনো তৃণমূল ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। ব্রিটেনে যেখানে শখের বশে সাধারণ মানুষের উদ্যোগে শত বছরের পুরনো ক্লাব সংস্কৃতি রয়েছে, চীনে সবকিছুই ছিল সরকার নিয়ন্ত্রিত। এর বাইরে বড় একটি বাধা হলো চীনের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুরা ফুটবল খেলতে শুরু করলেও মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছাতেই তারা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রচণ্ড মানসিক চাপে পড়ে যায়। ফলে ১২ বছর পার হতেই সিংহভাগ কিশোর খেলাধুলা পুরোপুরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। চীনের সমাজ ব্যবস্থা যেখানে অনেক বেশি ছকবাঁধা ও যৌথ শৃঙ্খলার ওপর নির্ভরশীল, সেখানে ফুটবল মাঠের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সৃজনশীলতা বা স্বতঃস্ফূর্ততার বিকাশ ঘটেনি।
তবে এই চরম হতাশার মধ্যেও চীনের ফুটবলে এখন আশার এক নতুন আলো দেখা যাচ্ছে। সিএসএল বা পেশাদার লিগ ছাপিয়ে দেশটির জিয়াংসু প্রদেশে শুরু হওয়া 'সুচাও' নামক একটি অপেশাদার লিগ এখন পুরো দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। যেখানে ডেলিভারি বয়, শিক্ষক, কোডার ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা খেলছেন, আর গ্যালারিতে খেলা দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন ৬০ হাজারেরও বেশি দর্শক। লাইভস্ট্রিমে এই ম্যাচগুলোর ভিউ ছাড়িয়ে গেছে শত কোটি। এই অপেশাদার লিগগুলো চীনের মানুষের মনে ফুটবল নিয়ে নতুন করে উন্মাদনা তৈরি করছে।
একই সঙ্গে চীনের সাবেক ফুটবল তারকা সান জিহাইয়ের মতো ব্যক্তিত্বরা এখন তৃণমূল থেকে প্রতিভা অন্বেষণে নেমেছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজার হাজার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য তারা সম্পূর্ণ অর্থায়নে ফুটবল একাডেমি গড়ে তুলছেন, যেখানে খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনারও সমান দায়িত্ব নেওয়া হচ্ছে। অভিভাবকরাও এখন বুঝতে শুরু করেছেন যে, খেলাধুলা পড়াশোনার ক্ষতি নয় বরং শিশুদের মানসিক বিকাশের অংশ। ফলে নিবন্ধিত তৃণমূল ফুটবলারের সংখ্যা গত এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এবং সম্প্রতি এই অপেশাদার লিগের চারজন তরুণ খেলোয়াড় অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দলেও ডাক পেয়েছেন। বিশ্বমঞ্চের স্বপ্ন থেকে অনেক দূরে ছিটকে গেলেও ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নিয়মের বাইরে গিয়ে চীনের সাধারণ মানুষের হাত ধরে ফুটবলের যে নতুন সংস্কৃতি জন্ম নিচ্ছে, তা হয়তো একদিন সত্যি তাদের বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে নিয়ে যাবে।
সূত্র: সিএনএন