আঞ্চলিক উত্তেজনায় নতুন প্রতিরক্ষা কৌশলে জাপান

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-০৮, | ০০:৪৬:৪৬ |
ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংবলিত সামরিক ড্রোন। এই ড্রোনই বদলে দিচ্ছে যুদ্ধের চিত্র। চীনের আঞ্চলিক সামরিক কার্যকলাপ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এবার জাপানও নিজস্ব প্রযুক্তির ড্রোন তৈরির কথা ভাবছে। এভাবেই আঞ্চলিক উত্তেজনায় বদলে যাচ্ছে জাপানের প্রতিরক্ষা কৌশল। জাপানের মন্ত্রিসভায় সম্প্রতি উত্থাপিত ৫৯৮ পৃষ্ঠার প্রতিরক্ষা দলিলে এসব প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে।  

দলিলের তথ্যমতে, জাপান নতুন যুদ্ধ পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করার চিন্তা করছে। ড্রোন উৎপাদন পরিকল্পনার পাশাপাশি দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দ্বীপগুলোতে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন শুরু করেছে টোকিও।  

বার্তা সংস্থা এপি লিখেছে, ওই দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে, চীনই জাপানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। প্রশান্ত মহাসাগরে চীনা যুদ্ধজাহাজের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ও ঘন ঘন চলাচলে জাপান উদ্বিগ্ন।

গত সপ্তাহে জাপানের প্রযুক্তিগত শিল্পপ্রতিষ্ঠান তোশিবা ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান  প্রোড্রোনের সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধ ড্রোন তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চালকবিহীন অস্ত্রটি জাপানের সামরিক সদস্যের ঘাটতি পূরণে সাহায্য করতে পারে। তবে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে ড্রোন তৈরি করা জাপানের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হবে। 

জাপান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ-পশ্চিম দ্বীপপুঞ্জে সামরিক শক্তি বাড়িয়েছে এবং দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে। কারণ দেশটি তাইওয়ানে আসন্ন একটি সংঘাত নিয়ে উদ্বিগ্ন। চীন ভূখণ্ডটিকে নিজের বলে দাবি করে আসছে। 

প্রতিরক্ষা দলিলে প্রশান্ত মহাসাগরে চীনা যুদ্ধজাহাজের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং ঘনঘন সামরিক কার্যকলাপকে বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চীনের বিরুদ্ধে  প্রতিরক্ষা কার্যক্রম শক্তিশালী করার জন্য একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করার কথাও উঠে এসেছে দলিলে। 

জাপানের পর্যবেক্ষণ বলছে, চীন স্বচ্ছতা ছাড়াই ধারাবাহিকভাবে সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে এবং দ্রুত পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা শক্তিশালী করেছে।

দলিলে উল্লেখ করা হয়, গত ডিসেম্বরে দক্ষিণ-পশ্চিম জাপানের কাছে মহড়ার সময় চীনা বিমানগুলো জাপানি বিমানের ওপর তাদের রাডার লক করেছিল, যা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সম্ভাব্য প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া গত জুনে প্রথমবারের মতো জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ ইও জিমার কাছে দুটি চীনা বিমানবাহী রণতরী দেখা গিয়েছিল। টোকিওর উদ্বেগ, বেইজিং তার সীমানা ছাড়িয়ে পূর্ব চীন সাগরের বিতর্কিত এলাকাগুলোতে দ্রুত সামরিক কার্যকলাপ প্রসারিত করছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জাপানের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা দেশটির সামরিক রূপান্তর প্রচেষ্টার কথা স্বীকার করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে শান্তিবাদী অঙ্গীকার বজায় রেখে আসছে জাপান। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠিত সংস্থা প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যাপারে জাপানকে এড়িয়ে চলে। কিন্তু ভূরাজনীতির ক্রমবর্ধমান উত্তাপ জাপানকে সামরিক পদক্ষেপে বাধ্য করাচ্ছে। 

বিশ্লেষকরা মনে করেন, জাপানের সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী অস্ত্র রফতানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেশটির অনুন্নত প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করতে পারে। জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি রয়টার্সকে বলেন, মিত্র দেশগুলোর মধ্যে অস্ত্র প্রযুক্তির ভাগাভাগি জাপানের প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করবে।  

জাপান সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে ১১টি উন্নত মোগামি-শ্রেণির ফ্রিগেটের উন্নয়ন ও হস্তান্তরসহ বেশ কিছু বড় চুক্তি করেছে। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গেও একই ধরনের একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তাছাড়া ফিলিপাইনের কাছে অবসরপ্রাপ্ত ডেস্ট্রয়ার বিক্রির চুক্তিও করেছে টোকিও। 

সামরিক অগ্রগতিতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও দেখছে টোকিও  
রয়টার্স জানায়, জাপান সরকার ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি বৃদ্ধিকে শুধু দেশ রক্ষার উপায় হিসেবেই নয়, বরং বৃহত্তর সমৃদ্ধির পথ হিসেবেও তুলে ধরছে। প্রতিরক্ষা দলিলে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষায় বিনিয়োগ বৃহত্তর অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার জন্য উপকারী।

দলিলে বলা হয়েছে, একটি ঝলমলে নগরীর পটভূমিতে সৈন্য, অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক কার্যক্রমের নকশা আকা হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, এই নকশার উদ্দেশ্য ছিল হলো 'ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভাবমূর্তি' তুলে ধরা। প্রতিরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির মেলবন্ধনে নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রস্তুত করা হচ্ছে। 

সামরিক বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, নতুন প্রতিরক্ষা কৌশলে জাপানের সামরিক ব্যয় আরো বাড়বে। এর প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে চীন-তাইওয়ান সংঘাত থেকে দুইপক্ষকে বিরত রাখা। এর ফলে জাপানও একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।  

ব্লুমবার্গ লিখেছে- চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সমন্বয় জাপানের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ওই প্রতিরক্ষা দলিলে ক্রমবর্ধমান উস্কানিমূলক চীনা-রুশ বোমারু বিমানের টহল এবং উত্তর কোরিয়ার সামরিক আধুনিকীকরণে মস্কোর সমর্থনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

জাপান মনে করে, চীন ও রাশিয়ার যৌথ বোমারু বিমানের ফ্লাইট এবং নৌ মহড়া স্পষ্টতই তাদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। এটি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর উদ্বেগের কারণ।
টোকিওর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজের গবেষক রিহো আইজাওয়ার মতে, সামরিক মহড়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকেত পাঠানোর ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়া আরও ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। 

আইজাওয়া সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, চীন ও রাশিয়ার মধ্যে এখন এমন একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক স্বার্থে রাশিয়ার সামরিক শক্তির সমর্থনে জাপানের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে চীন। 

চীন-জাপান বিরোধের নেপথ্যে  

পূর্ব চীন সাগরের ছোট জনবসতির দ্বীপ সেনকাকু নিয়ে দুই দেশের সার্বভৌমত্বের বিরোধ রয়েছে। চীন দ্বীপটিকে দিয়াওয়ু বলে ডাকে। এটিই জাপান–চীন ভূখণ্ডগত বিরোধের প্রধান কেন্দ্র।

এছাড়া তাইওয়ান নিয়ে চীন ও জাপানের মধ্যে কৌশলগত এবং বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিরোধ রয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা দলিলেও তাইওয়ান নিয়ে জাপানের বড় উদ্বেগ থাকার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। 

তাছাড়া পূর্ব চীন সাগরের সামুদ্রিক এলাকা, বিশেষ করে চীনের কোস্টগার্ডের তৎপরতা এবং তেল-গ্যাস নিয়ে দুদেশের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। 

সূত্র: রয়টার্স, এপি ও ব্লুমবার্গ।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..