এক নির্মম সত্য বদলে দিয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাস, কী আসছে আগামীতে?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-০৭, | ২০:১৪:১৯ |
রোদের তীব্রতার বদলে আকাশ ছেয়ে রয়েছে ঘন কুয়াশা আর ধূসর মেঘের আস্তরণে। গায়ে মোটা চাদর জড়িয়েও কাঁপছে মানুষজন। হিমেল বাতাস শরীর কাঁপিয়ে দিচ্ছে। অথচ ক্যালেন্ডার বলছে, জুন মাসের মাঝামাঝি এই সময়ে তীব্র গরম থাকার কথা। কিন্তু রোদের উত্তাপ বা গরমের হাঁসফাঁস নেই কোথাও। দিন যত গড়াচ্ছে, ঠাণ্ডা ততই বাড়ছে। মাঠের সবুজ ঘাস ঢেকে যাচ্ছে সাদা বরফে। ক্ষেতে থাকা গম আর ভুট্টা নুয়ে পড়ছে বরফের ভারে।

কৃষকদের চোখেমুখে গভীর দুশ্চিন্তা। জুন পেরিয়ে জুলাই এলো, তুষারপাত কমার নামই নেই। আগস্ট পড়তে না পড়তেই দেখা দিল চরম খাদ্যসংকট। বাজারে খাবারের চড়া দাম, চারদিকে আতঙ্ক। সবার মনে একটাই প্রশ্ন—গ্রীষ্ম কি এ বছর আর ফিরবে না? এ কোনো কাল্পনিক গল্পের প্লট নয়।

এটি বিশ্ব ইতিহাসের এক নির্মম সত্য। ঘটনাটি ১৮১৬ সালের। পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের বিস্তীর্ণ অঞ্চল তখন এমনই এক ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার একাংশে গ্রীষ্মের উপস্থিতিই যেন মুছে গিয়েছিল। ইতিহাসে এই সময়টি পরিচিত হয়ে আছে ‘দ্য ইয়ার উইদাউট আ সামার’ বা ‘গ্রীষ্মহীন বছর’ নামে। কিন্তু হঠাৎ কেন বদলে গিয়েছিল পৃথিবীর ঋতুচক্র? এর কারণ লুকিয়ে ছিল হাজার কিলোমিটার দূরের ইন্দোনেশিয়ার এক মহাবিপদে।

১৮১৫ সালের এপ্রিল মাসে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে ইন্দোনেশিয়ার মাউন্ট তামবোরা আগ্নেয়গিরিতে। গত ১ হাজার ৮০০ বছরের ইতিহাসে এটিকেই বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অগ্ন্যুৎপাত মনে করা হয়। বিস্ফোরণে কোটি কোটি টন আগ্নেয় ছাই, ধুলো ও সালফার ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে পৌঁছে যায়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই কণাগুলো পৃথিবীকে ঘিরে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে। ফলে সূর্যের আলো স্বাভাবিকভাবে মাটিতে পৌঁছাতে পারছিল না। প্রতিফলিত হয়ে তা মহাকাশে ফিরে যাচ্ছিল। এর প্রভাবে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা দ্রুত কমতে শুরু করে, যার করুণ ফল ভোগ করতে হয় পরের বছর অর্থাৎ ১৮১৬ সালে।

সবচেয়ে বড় আঘাত আসে কৃষি খাতে। জুন-জুলাইয়ে তুষারপাতের কারণে আমেরিকা ও ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গম, ভুট্টা ও আলুর মতো ফসল নষ্ট হয়ে যায়। কয়েক মাসের মধ্যে খাদ্যসংকট ভয়াবহ রূপ নেয়। ফ্র্যান্স, ব্রিটেনসহ ইউরোপজুড়ে খাদ্যের দাবিতে দাঙ্গা শুরু হয়। সুইজারল্যান্ড পরিস্থিতি সামাল দিতে ‘জাতীয় দুর্ভিক্ষ’ ঘোষণা করে।

এই বিপর্যয়ের প্রভাব পড়ে এশিয়াতেও। ভারতে বর্ষার স্বাভাবিক গতিপথ এলোমেলো হয়ে যায়। দেখা দেয় অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির তাণ্ডব। ফলে বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মারণব্যাধি কলেরা।

১৮১৬ সালের সেই মেঘলা ও কনকনে ঠাণ্ডা গ্রীষ্মে সুইজারল্যান্ডের লেক জেনেভার পাশে একটি ভিলায় আটকে পড়েছিলেন কবি লর্ড বায়রন, পার্সি বিশি শেলি ও তরুণী লেখিকা মেরি গডউইন। ঘরের বাইরে টানা বৃষ্টি আর হিমেল হাওয়া। দীর্ঘ অলস সময় কাটাতে তারা ভূতের গল্প লেখার বাজি ধরেন। সেই আড্ডা থেকেই জন্ম নেয় মেরি শেলির বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’। একই বৈঠকে চিকিৎসক জন পোলিডোরি লেখেন, ‘দ্য ভ্যাম্পায়ার’, যা থেকে সূচনা হয় আধুনিক ভ্যাম্পায়ার সাহিত্যের।

ফসলের পাশাপাশি গোখাদ্য বা ওটসের জোগান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মারা যায় হাজার হাজার ঘোড়া। তৎকালীন সময়ে চলাচলের প্রধান মাধ্যম ছিল এই প্রাণীটি। এই সংকট থেকেই বিকল্প হিসেবে ১৮১৭ সালে জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল ড্রেইস উদ্ভাবন করেন দুই চাকার কাঠের এক ‘রানিং মেশিন’। এটিই পরে আধুনিক সাইকেলের ভিত্তি গড়ে দেয়।

কৃষক পরিবারগুলো সর্বস্ব হারিয়ে নতুন জীবনের খোঁজে মার্কিন মুলুকের পশ্চিম দিকে পাড়ি জমায়। ওহাইও ও ইন্ডিয়ানার মতো অঞ্চলে গড়ে ওঠে বসতি, যা ইতিহাসে ‘ওয়েস্টওয়ার্ড এক্সপ্যানশন’ নামে পরিচিত।

ভবিষ্যতেও কি এমন বিপদ সম্ভব?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এত বড় অগ্ন্যুৎপাত সচরাচর না ঘটলেও একেবারে অসম্ভব নয়। ১৯৯১ সালে ফিলিপাইনের মাউন্ট পিনাতুবো অগ্ন্যুৎপাতের পর বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রায় ১ ডিগ্রি ফারেনহাইট কমে গিয়েছিল। ভবিষ্যতে তামবোরার মতো বড় কোনো বিস্ফোরণ ঘটলে বর্তমান বিশ্বের জলবায়ু ও খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে তা মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..