✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-০৭, | ১৯:২৯:০৩ |মার্কিন গবেষকরা প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে প্রকৃতিতে সচরাচর দেখা যায় না, এমন নতুন ভাইরাস তৈরি করা হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এটি একটি অভূতপূর্ব বৈজ্ঞানিক সাফল্য, যা চিকিৎসা ক্ষেত্রে অগ্রগতির আশা জাগানোর পাশাপাশি এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগও সৃষ্টি করেছে।
‘সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং এমআইটি ও হার্ভার্ডের ব্রড ইনস্টিটিউটের গবেষকরা জানিয়েছেন, তারা প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত একটি ‘ফেজ’, যা এক ধরনের ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে। তাকে ভিত্তি বা টেমপ্লেট হিসেবে ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে হাজার হাজার জিনোম তৈরি করেছেন।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার(৬ আগস্ট) প্রকাশিত গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, গবেষকরা প্রায় ৩০০টি জিনোম রাসায়নিকভাবে সংশ্লেষণ করে পরীক্ষাগারের পরিবেশে সেগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করেছেন। এর ফলে ১৬টি ‘কার্যক্ষম’ ভাইরাস পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ভাইরাসের তুলনায় এই কৃত্রিম ভাইরাসগুলোর মিশ্রণ ‘ই. কোলাই’ ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করার ক্ষেত্রে অধিক কার্যকর।
‘সায়েন্স’ জার্নালের গবেষকরা লিখেছেন, আমাদের এই পদ্ধতি ‘ডাইরেক্টেড ইভোলিউশন’ ও ‘র্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর পাশাপাশি সিন্থেটিক জিনোমিক্সের সক্ষমতাকে আরও প্রসারিত করে। এটি দ্রুত পরিবর্তনশীল রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে অভিযোজনক্ষম ও সহনশীল ‘ফেজ থেরাপি’ তৈরির পথ প্রশস্ত করে। এছাড়াও বড় ও জটিল জিনোম তৈরির নকশা প্রণয়নের ভিত্তি স্থাপন করে।
গবেষণাপত্রটির অন্যতম দুই লেখক ব্রায়ান হাই এবং স্যামুয়েল কিং -এর সঙ্গে মন্তব্যের জন্য আলজাজিরার পক্ষ থেকে করা হলে তারা তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া দেননি। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় ও টরন্টো জেনারেল হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ আইজ্যাক বোগোচ। তিনি এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি দাবি করেছেন, এই গবেষণাটি একইসঙ্গে আশাব্যঞ্জক ও উদ্বেগজনক উভয় ধরনের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
বোগোচ আল জাজিরাকে বলেন, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নকশা করা ভাইরাসের কিছু সম্ভাব্য সুবিধা থাকতে পারে। যেমন, এমন সব সুনির্দিষ্ট ব্যাকটেরিওফাজের সৃষ্টি করা, যা হয়তো অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের বিরুদ্ধে নতুন উপায়ে লড়াই করতে আমাদের সহায়তা করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, তবে সম্পূর্ণ ও কার্যকর ভাইরাস তৈরির এই সক্ষমতাটিই সহজেই গুরুতর জৈব-নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, যদি তা ক্ষতিকর রোগজীবাণুর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। তাই এই প্রযুক্তির বিকাশের পাশাপাশি কঠোর সুরক্ষা ব্যবস্থা, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া এবং তদারকি ব্যবস্থাও গড়ে তোলা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
সিডনির ইউএনএসডব্লিউ স্কুল অফ বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড বায়োমলিকুলার সায়েন্সেসের অধ্যাপক ফাতেমেহ ভাফায়ি বলেন, যদিও এই গবেষণাটি মানুষের জন্য কোনো প্রত্যক্ষ ঝুঁকি তৈরি করে না। কারণ ফাজগুলো কেবল ব্যাকটেরিয়াকেই সংক্রমিত করতে পারে। তবুও এতে ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলো ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে ব্যবহারের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ভাফায়ি আল জাজিরাকে বলেন, তাই বিষয়টি এমন নয়, আমাদের কি এই ভাইরাসটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। বরং মূল বিষয় হলো ‘এআই এখন এমন কাজ করতে সক্ষম’। আর এ কারণেই গবেষকরা কোনো বাস্তব বিপদের প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং আগাম সতর্কতা হিসেবে জৈব-নিরাপত্তা তদারকি ব্যবস্থা আরও জোরদার করার আহ্বান জানাচ্ছেন।
এআই-এর সক্ষমতায় দ্রুত অগ্রগতির ফলে ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তি বা কোনো সিস্টেমের অনিয়ন্ত্রিত বা ‘রোগ’ আচরণ থেকে ক্ষতির আশঙ্কার বিষয়টি যখন সামনে আসছে, ঠিক তখনই এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটল। যুক্তরাজ্য সরকারের এআই বিষয়ক তদারকি সংস্থা এই সপ্তাহে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক এক নিয়মিত নিরাপত্তা মূল্যায়নের সময় অ্যানথ্রোপিক ও ওপেনএআই-এর অত্যাধুনিক এআই মডেলগুলো প্রকৃত মানুষ ও বিভিন্ন সংস্থাকে লক্ষ্য করে ‘স্বয়ংক্রিয়’ ও ‘অননুমোদিত’ ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছিল।
এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, এই অনিয়ন্ত্রিত বা ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি ঘটনায় অ্যানথ্রোপিকের ‘ক্লড মিথোস ৫’ মডেলটি ভুয়া অনলাইন পরিচয় তৈরি করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল কোনো ডেভেলপার প্ল্যাটফর্মে থাকা একটি ওপেন-সোর্স প্রজেক্টে ক্ষতিকর কোড প্রবেশ করানো।
তদারকি সংস্থাটির এই তথ্যের আগে গত মাসেই ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছিল, তাদের শীর্ষস্থানীয় মডেলগুলো মানুষের কোনো নির্দেশনা ছাড়াই বিভিন্ন সংস্থার বিরুদ্ধে হ্যাকিংয়ের মতো কর্মকাণ্ড চালিয়েছিল। দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর দিকে শিথিল বা নমনীয় নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নিলেও, পরবর্তীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রমশ সরাসরি ও কঠোর তদারকির নীতি গ্রহণ করেছেন।
গত জুন মাসে ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন, যার লক্ষ্য ছিল অত্যাধুনিক বা ‘ফ্রন্টিয়ার’ এআই মডেলগুলো বাজারে ছাড়ার আগে সেগুলোর মূল্যায়নের জন্য একটি স্বেচ্ছাধীন কাঠামো তৈরি করা। ট্রাম্প প্রশাসন তাদের এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়া বা মানদণ্ডগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি, যা প্রযুক্তি খাতের পর্যবেক্ষকদের সমালোচনার মুখে পড়েছে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের সিন্থেটিক জিনোম ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞ টম এলিস বলেন, স্ট্যানফোর্ডের গবেষকদের ফলাফলগুলো ‘চমকপ্রদ" হলেও, এগুলো এটাও দেখিয়েছে কোষ বা বড় আকারের ভাইরাসের জন্য জটিল জিনোম তৈরির সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে এআই এখনও কতটা পিছিয়ে আছে।
আল জাজিরাকে এলিস বলেন, এই ফাজ জিনোমটি আক্ষরিক অর্থেই নকশা ও তৈরির জন্য সবচেয়ে ছোট ও সহজ জিনোম। কারণ ফাজগুলো মিউটেশন বা পরিব্যক্তি বেশ ভালোভাবে সহ্য করতে পারে এবং দ্রুত বিবর্তিত হয়ে সেগুলোকে কাজে লাগাতে সক্ষম।
তিনি আরও বলেন, তুলনামূলকভাবে বলতে গেলে কোভিড ভাইরাসের জিনোম এর চেয়ে ছয় গুণ বড়। আর কোনো মডেলের মাধ্যমে বড় কিছু তৈরির জটিলতা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। তাই ছয় গুণ বড় কোনো কিছু তৈরির কাজ সম্ভবত ১০০ গুণ বেশি কঠিন হবে।
এলিস উল্লেখ করেন, যদিও এই গবেষণার সঙ্গে জৈব-নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত, তবুও এআই-এর মাধ্যমে তৈরি প্যাথোজেন বা রোগজীবাণুর চেয়ে প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান ভাইরাসগুলোর পরিবর্তন বা ম্যানিপুলেশন অনেক বেশি গুরুতর ও জরুরি উদ্বেগের বিষয়।তিনি বলেন, প্রকৃতিতে যখন ইতোমধ্যেই প্রচুর রোগজীবাণু বা প্যাথোজেন সহজলভ্য, তখন সেগুলোর নকশা তৈরিতে এআই-এর ব্যবহার হবে হাস্যকর।
সিঙ্গাপুরের ‘এশিয়া সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটি’-র পরিচালক সু লি ইয়াং বলেন, যদিও এআই ব্যবহার করে ভাইরাসকে আরও প্রাণঘাতী করে তোলার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তবুও এই গবেষণার ফলাফল বা প্রভাবকে অতিরঞ্জিত করে দেখা উচিত নয়।
সু আল জাজিরাকে বলেন, বিষয়টি বিজ্ঞান ও গবেষণাগারের সামান্য অভিজ্ঞতা থাকলেই কেউ এখন নিজের গ্যারেজে বসে জীবন রক্ষাকারী কিংবা বিপজ্জনক ভাইরাস তৈরি করে ফেলতে পারবে। তিনি আরও বলেন, নকশা তৈরির পরবর্তী ধাপগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ‘ওয়েট ল্যাবরেটরি’ (বাস্তব পরীক্ষাগার) সক্ষমতা এখনও অনেক বড় একটি বিষয় এবং এতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। সু যোগ করেন, আমি বিষয়টিকে একই সঙ্গে মূল্যবান এবং উদ্বেগজনক বলে মনে করি। যেমনটা সাধারণত দ্বৈত ব্যবহারের সম্ভাবনাসম্পন্ন গবেষণার ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।
সূূত্র: আলজাজিরা।