একই দেশের প্রায় ৬ হাজার শ্বেতাঙ্গ শরণার্থীকে আশ্রয় দিল যুক্তরাষ্ট্র

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-০৯, | ২১:২৪:৫৫ |

চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ৯৪৮ জন শরণার্থী গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের প্রায় সবাই দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের জনসংখ্যা, শরণার্থী ও অভিবাসন বিষয়ক ব্যুরো থেকে প্রকাশিত নতুন পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ডোনাল্ড ট্রাম্পের জারি করা একটি প্রেসিডেন্সিয়াল মেমোর পর এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ওই মেমোতে ট্রাম্প স্পষ্ট করেছিলেন যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বার্ষিক শরণার্থী গ্রহণের সংখ্যা কমিয়ে মাত্র ৭ হাজার ৫০০ জনে নামিয়ে আনতে চান এবং দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।

পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র এবং স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের সেক্রেটারিদের পাঠানো ওই মেমোতে বলা হয়, এক্সিকিউটিভ অর্ডার ১৪২০৪ অনুযায়ী, শরণার্থী কোটা প্রধানত দক্ষিণ আফ্রিকার আফ্রিকানারদের (দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত ডাচ বংশোদ্ভূত শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী) জন্য বরাদ্দ করা হবে। এছাড়া, নিজ নিজ দেশে অবৈধ বা অন্যায্য বৈষম্যের শিকার হওয়া অন্যান্য ভুক্তভোগীদেরও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বার্ষিক শরণার্থী গ্রহণের সীমায় এই কাটছাঁট যথাযথভাবে কার্যকর করা হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মেয়াদের শেষ বছর ২০২৪ সালে ১ লাখ ৬০ জন শরণার্থীকে গ্রহণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, যা সেই সময়ের ১ লাখ ২৫ হাজার জনের সর্বোচ্চ সীমা থেকে বেশ কম ছিল।

গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত তথ্য দিয়েছে ব্যুরো। এতে দেখা যায়, ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে মোট ৬ হাজার ৬৬৮ জন শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। এর মধ্যে তিনজন ছাড়া বাকি সবাই দক্ষিণ আফ্রিকার বাসিন্দা।

গত নভেম্বরে কলোরাডো অঙ্গরাজ্যে তিন আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। এই ব্যতিক্রমটুকু বাদ দিলে শরণার্থীদের তালিকায় দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গদেরই একচ্ছত্র আধিপত্য। 

ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে, দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গরা— যারা ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীদের বংশধর—দেশটির কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর হাতে 'অন্যায় বর্ণবৈষম্য', এমনকি 'গণহত্যার' শিকার হচ্ছে। যদিও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট বারবারই নিশ্চিত করেছেন যে, পরিস্থিতি মোটেও এমন নয়।

বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও ট্রাম্পের সাবেক মিত্র ইলন মাস্কও একই ধরনের যুক্তি প্রচার করেছেন। মাস্কের জন্ম ও বেড়ে ওঠা দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়াতে। 

ট্রাম্পের ডেপুটি চিফ অভ স্টাফ ফর পলিসি স্টিফেন মিলার গত মে মাসে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, 'দক্ষিণ আফ্রিকায় যা ঘটছে, তা শরণার্থী কর্মসূচি কেন তৈরি হয়েছিল তার পাঠ্যপুস্তিকাসুলভ সংজ্ঞার সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। এটি একটি সুরক্ষিত বৈশিষ্ট্য-ভিত্তিক নিপীড়ন, এক্ষেত্রে সেটি জাতিগত পরিচয়। এটি জাতি-ভিত্তিক নিপীড়ন।

শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের প্রথম দলটি যখন ওয়াশিংটন ডুলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল, তার পরপরই ট্রাম্প মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে তাদের দুর্দশাকে উপেক্ষা করার জন্য তিরস্কার করেন। তিনি বলেন, ওখানে একটা গণহত্যা চলছে, যা নিয়ে আপনারা লিখতে চান না। এটা একটা ভয়ংকর ঘটনা। ওখানে কৃষকদের হত্যা করা হচ্ছে। ওরা শ্বেতাঙ্গ। তবে ওরা শ্বেতাঙ্গ না কৃষ্ণাঙ্গ, তা আমার কাছে কোনো পার্থক্য তৈরি করে না। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে, তাদের জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

গত বছর ওভাল অফিসে সরাসরি সাক্ষাতের সময় দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা ট্রাম্পের এই দাবিগুলো খণ্ডন করেছিলেন। এমনকি ট্রাম্প যখন তাকে কথিত এই নৃশংসতার ছবি ও ভিডিও 'প্রমাণ' হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন, তখনও রামাফোসা তা নাকচ করে দেন।

পরে রামাফোসার মুখপাত্র ভিনসেন্ট মাগোনিয়া এনপিআর-এ দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে যাওয়া শ্বেতাঙ্গদের উদ্দেশ্যে বলেন, এই মানুষগুলোর চলে যাওয়া থামানো হবে না, যদিও তারা মিথ্যা বয়ানের ভিত্তিতে যাচ্ছে। এই পদক্ষেপকে অনুমোদন দেওয়া নির্বাহী আদেশের কোনো আইনি বা বাস্তব ভিত্তি নেই। শরণার্থীদের সংজ্ঞায় আন্তর্জাতিক আইনের কোনো বিধানই এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ক্রিসপিন ফিরি দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, শরণার্থী হওয়ার ভান করে দক্ষিণ আফ্রিকানদের যুক্তরাষ্ট্রে পুনর্বাসন সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এর লক্ষ্য হলো দক্ষিণ আফ্রিকার সাংবিধানিক গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।

এরপর নভেম্বরে ৪০ জনেরও বেশি বিশিষ্ট শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান ট্রাম্পের এই দাবির বিরুদ্ধে— যে তারা গণহত্যার শিকার হচ্ছেন—তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। এক খোলা চিঠিতে এই নাগরিকরা ট্রাম্পকে বলেন, তারা আমেরিকার সংস্কৃতি যুদ্ধের দাবার ঘুঁটি নন।

রয়টার্সের তথ্যমতে, ২১ মে-র এক প্রেসিডেন্সিয়াল ডিটারমিনেশন থেকে জানা যায়, ট্রাম্প তবু তার অবস্থানে অটল। তিনি মনে হচ্ছে এই বছর শরণার্থী গ্রহণের সীমা বাড়িয়ে ১০ হাজার করার পরিকল্পনা করছেন, যাতে আরও বেশিসংখ্যক শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারে।

তথ্যসূত্র : ইন্ডিপেনডেন্ট

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..