পেলের জন্য থেমেছিল গৃহযুদ্ধ!

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-০৭, | ২৩:৫২:২৮ |
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত কিংবদন্তিগুলোর একটি হলো—সর্বকালের সেরা ফুটবলার পেলের জন্য নাকি একসময় থেমে গিয়েছিল নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ। বহু বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এই গল্প প্রায় সত্য ঘটনা হিসেবেই প্রচারিত হয়েছে।

বলা হয়েছে, পেলের ক্লাব সান্তোসের খেলা দেখার জন্য যুদ্ধরত দুই পক্ষ সাময়িকভাবে অস্ত্র নামিয়ে রেখেছিল।

কিন্তু ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে বেরিয়ে আসা নতুন তথ্য বলছে, বহুল প্রচারিত এই গল্পের পেছনে বাস্তবের চেয়ে কিংবদন্তির অংশই হয়তো বেশি।

১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত চলা নাইজেরিয়ার গৃহযদ্ধ ছিল আফ্রিকার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সংঘাত। বিআফ্রার স্বাধীনতার দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে লাখো মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়।

এমন এক অস্থির সময়েই ১৯৬৯ সালে আফ্রিকা সফরে বের হয় সান্তোস। সে সময় পেলে, কৌতিনিও ও পেপেদের নিয়ে গড়া দলটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্লাবগুলোর একটি। বিশ্বজুড়ে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে বিপুল দর্শক টানত তারা।

প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, সান্তোস নাইজেরিয়ায় পৌঁছানোর পর যুদ্ধরত পক্ষগুলো সাময়িকভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে, যাতে মানুষ পেলের খেলা দেখতে পারে।

সান্তোসের কয়েকজন সাবেক খেলোয়াড়ও পরে এমন দাবি করেছিলেন। তাদের ভাষ্য ছিল, ম্যাচ শেষে বিমান উড্ডয়ন করার পর আবার নিচে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়।

সাবেক তারকা লিমা একবার বলেছিলেন, ‘একটি যুদ্ধ থামাতে পেরেছিলাম, এটিও ছিল আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের আরেকটি প্রমাণ।’

এমনকি ২০০৫ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মার্কিন সাময়িকী টাইমও উল্লেখ করেছিল যে, যেখানে কূটনীতিকরা দুই বছরেও যুদ্ধ থামাতে পারেননি, সেখানে পেলের আগমন কয়েক দিনের জন্য সংঘাত বন্ধ করে দিয়েছিল।

তবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক নাইজেরীয় গবেষক ও লেখক ওলাওজো আইয়েগবায়ো আর্কাইভ ঘেঁটে ভিন্ন চিত্র খুঁজে পান।

তার গবেষণায় দেখা যায়, সান্তোসের সফরের সময়কার স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোতে কোথাও আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির উল্লেখ নেই। অথচ এমন একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটলে তা বড় শিরোনাম হওয়ার কথা ছিল।

আইয়েগবায়োর মতে, সান্তোসের আফ্রিকা সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানবিক উদ্যোগ নয়, বরং প্রদর্শনী ম্যাচের মাধ্যমে আয় করা। সেই সফরের অংশ হিসেবেই দলটি কঙ্গো, নাইজেরিয়া, মোজাম্বিক, ঘানা ও আলজেরিয়া সফর করেছিল।

মজার বিষয় হলো,  পেলে নিজেও বিভিন্ন সময়ে ঘটনাটি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত তার আত্মজীবনী ‘মাই লাইফ অ্যান্ড দ্য বিউটিফুল গেম’-এ কোথাও যুদ্ধবিরতির কথা উল্লেখ ছিল না। তবে ২০০৭ সালে প্রকাশিত ‘পেলে: দ্য অটোবায়োগ্রাফি’ বইয়ে তিনি লেখেন, নাইজেরীয়রা নিশ্চিত করেছিল যেন বিআফ্রার বাহিনী তাদের অবস্থানকালে লাগোসে আক্রমণ না করে।

সেখানে পেলে স্মরণ করেন, শহরের রাস্তাজুড়ে ছিল ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি এবং তাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিল সেনাবাহিনী ও পুলিশ।

তিনি আরো উল্লেখ করেন, সান্তোসের এক কর্মকর্তা খেলোয়াড়দের আশ্বস্ত করেছিলেন যে ম্যাচের জন্য যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়া হবে। তবে পেলে নিজে কোথাও নিশ্চিতভাবে বলেননি যে তিনি যুদ্ধবিরতি প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে গল্পটি নানা রূপ পেয়েছে। কেউ বিশ্বাস করেন, পেলের জনপ্রিয়তা অন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছিল। অন্যদের মতে, এটি পরবর্তীকালে তৈরি হওয়া এক ফুটবলীয় মিথ, যা বারবার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে ‘সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

আজ পর্যন্ত এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা নিশ্চিতভাবে বলে যে পেলের খেলা দেখার জন্য নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি হয়েছিল।

যুদ্ধ সত্যিই থেমেছিল কি না, তার চূড়ান্ত উত্তর হয়তো আর কখনো জানা যাবে না। তবে একটি বিষয় নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই—পেলের জনপ্রিয়তা ছিল অসাধারণ। পৃথিবীর যেখানেই তিনি খেলতে গেছেন, হাজার হাজার মানুষ তাকে এক নজর দেখার জন্য ভিড় করেছে।

হয়তো তিনি যুদ্ধ থামাননি। কিন্তু তিনি এমন এক বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন, যিনি ভাষা, দেশ ও রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে কোটি মানুষকে এক সুতোয় গেঁথেছিলেন। যিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও ফুটবলের আনন্দে একত্রিত করতে পেরেছিলেন।

আর সেই কারণেই, সত্য হোক বা কিংবদন্তি—পেলের নামের সঙ্গে আজও জড়িয়ে আছে সেই অবিশ্বাস্য গল্প,  একজন ফুটবলারের জন্য নাকি থেমে গিয়েছিল যুদ্ধ।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..