✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-০৭, | ২০:১৮:৪১ |দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় আগে ২০০৩ সালের এক আগস্টে কাজাখস্তানের বিপক্ষে এক মলিন মাঠে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে পা রেখেছিলেন ১৮ বছর বয়সী এক তরুণ। তখন হয়তো কেউ ভাবেনি, মেদেইরা থেকে আসা সেই ছেলেই একদিন বিশ্ব ফুটবলের সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দেবেন। ২০২৬ সালে এসে সেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এখন ৪১ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলার অপেক্ষায়, যা ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য নজির। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ১৪৩ গোল করা এই মহাতারকা পর্তুগিজ ফুটবলের মানসিকতাই বদলে দিয়েছেন।
কিন্তু এবারের বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে পর্তুগালে একটি প্রশ্ন বেশ জোরেসোরেই উচ্চারিত হচ্ছে, পর্তুগাল দল কি আসলে রোনালদোকে ছাড়াই বেশি কার্যকর, আর তিনি কি আসলেই দলে অটো-চয়েজ বা অপরিহার্য?
একটা সময় পর্তুগালে রোনালদোর স্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল মনে করা হতো। তবে সময় বদলেছে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের হয়ে খেলা কিংবদন্তি আন্তোনিও সিমোয়েসের মতো সাবেক তারকারা এখন প্রকাশ্যেই বলছেন যে, রোনালদো এখন আর দলের জন্য নয় বরং নিজে মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকার জন্য খেলেন। দেশের ক্রীড়া বিশ্লেষকদের একাংশও মনে করেন, বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখা একটি দলের শুরুর একাদশে থাকার মতো ফুটবলীয় ধার এখন আর রোনালদোর নেই। এই আলোচনার পালে হাওয়া দিচ্ছে সাম্প্রতিক কিছু পরিসংখ্যানও।
পর্তুগাল দলের কোচ রবের্তো মার্তিনেসের অধীনে দল যখন তাদের ইতিহাসের অন্যতম বড় দুটি জয় তুলে নেয় লুক্সেমবার্গের বিপক্ষে (৯-০) এবং আর্মেনিয়ার বিপক্ষে ৯-১ গোলের বিধ্বস্ত করার ম্যাচ; দুটি ম্যাচেই মাঠের বাইরে ছিলেন রোনালদো। ফলে স্বভাবতই আলোচনা শুরু হয়েছে, তরুণ ও গতিময় পর্তুগিজ মাঝমাঠ এবং আক্রমণভাগ রোনালদোর অনুপস্থিতিতে আরও বেশি স্বাধীন ও ক্ষুরধার হয়ে ওঠে কি না।
অবশ্য এই সমালোচনার বিপরীতে শক্ত ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন খোদ কোচ রবের্তো মার্তিনেস এবং রোনালদোর সাবেক সতীর্থরা। মার্তিনেস এই বিতর্ককে স্রেফ গুরুত্বহীন আড্ডা হিসেবে উড়িয়ে দিয়ে রোনালদোর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের দিকে আঙুল তুলছেন। কোচের অধীনে শেষ ৩১ ম্যাচে ২৫ গোল করেছেন আল-নাসরের এই ফরোয়ার্ড। মার্তিনেসের সাফ কথা, রোনালদো অতীতে কী করেছেন সেই যোগ্যতায় নয় বরং এখনো সর্বোচ্চ স্তরে পারফর্ম করছেন বলেই দলে আছেন। সাবেক সতীর্থদের মতে, ৪১ বছর বয়সে এসে রোনালদোর গতি হয়তো কিছুটা কমেছে, কিন্তু তার নিখুঁত টেকনিক, গোল করার সহজাত প্রবৃত্তি এবং মাঠে তরুণদের ওপর তার মানসিক প্রভাব এখনো প্রতিপক্ষের জন্য সমান বিপজ্জনক। ১৭ জুন ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে পর্তুগাল যখন তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে, তখনো দলের মূল রণকৌশল যে তাকে ঘিরেই আবর্তিত হবে, তা বলাই বাহুল্য।
মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি মাঠের বাইরেও রোনালদোর প্রভাব নিয়ে বিতর্ক কম নয়। কাতার বিশ্বকাপে তাকে বেঞ্চে বসানোর খেসারত দিতে হয়েছিল তৎকালীন কোচ ফেরনান্দো সান্তোসকে, হারাতে হয়েছিল চাকরি। এমনকি সম্প্রতি পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন রোনালদোর মালিকানাধীন একটি কোম্পানির সাথে ব্যবসায়িক চুক্তি করায় স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নও উঠেছে, যদিও ফেডারেশন তা জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে। দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েনকা অবশ্য জানিয়েছেন, রোনালদো-পরবর্তী যুগের জন্য তারা মানসিকভাবে প্রস্তুত এবং তার বিদায়ের পর ফেডারেশনের আর্থিক বা কাঠামোগত কোনো ক্ষতি হবে না।
ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে এসে রোনালদোর সামনে এখন দুটি বড় লক্ষ্য; ইউসেবিওর করা পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৯ গোলের রেকর্ড ভাঙা এবং দেশকে অধরা বিশ্বকাপ ট্রফি এনে দেওয়া। মাঠের ভেতরের এবং বাইরের সমস্ত আলোচনা ও সমালোচনাকে পেছনে ফেলে সিআরসেভেন তার শেষ বিশ্বকাপে সমালোচকদের পাণ্ডুলিপি বদলে দিতে পারেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
বিবিসি