জম্মু ও কাশ্মীর ‘কখনোই ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল না, নয় এবং কখনো হবেও না’ বলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সাফ জানিয়ে দিয়েছে পাকিস্তান। বিতর্কিত এ অঞ্চলটি নিয়ে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে শুরু হওয়া এক কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে নয়াদিল্লির দাবি প্রত্যাখ্যান করে ইসলামাবাদ এ মন্তব্য করেছে।
জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি পার্বথানেনি হরিশ কাশ্মীরকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করার পর পাকিস্তানের পক্ষে জবাব দেওয়ার অধিকার (রাইট অব রিপ্লাই) প্রয়োগ করে এ মন্তব্য করেন পাকিস্তানি কূটনীতিক গুল কায়সার সারওয়ানি।
১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে সারওয়ানি বলেন, ভারত অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীর যে একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিরোধপূর্ণ অঞ্চল, তা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এজেন্ডায় এখনো রয়েছে।
তিনি বলেন, কোনো ধরনের বিভ্রান্তি ছড়িয়ে এ বিরোধের ঐতিহাসিক, আইনি ও আন্তর্জাতিক চরিত্রকে বদলে দেওয়া যাবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জম্মু ও কাশ্মীর কখনোই ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল না, নয় এবং কখনো হবেও না।
এর আগে জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আসিম ইফতিখার আহমেদ বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের বার্ষিক প্রতিবেদনে জম্মু-কাশ্মীর ও ফিলিস্তিন- উভয় সংকটেরই ধারাবাহিক প্রাসঙ্গিকতার বিষয়টি উঠে এসেছে। জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব অনুযায়ী এ দুই সংকটের সমাধান হওয়া জরুরি। তার ই বক্তব্যের পরই দুদেশের মধ্যে এ কূটনৈতিক বাকযুদ্ধ শুরু হয়।
সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত আসিম উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালীন নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনে ‘ভারত-পাকিস্তান প্রশ্ন’ সংক্রান্ত ২০টিরও বেশি চিঠি বা যোগাযোগ নিরাপত্তা পরিষদের নজরে আনা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ২০২৫ সালের মে মাসে নিরাপত্তা পরিষদ এই ইস্যুতে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকও করেছে। এর মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় যে, এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সাত দশকেরও বেশি সময় পরও কাশ্মীর বিরোধটি এখনো নিরাপত্তা পরিষদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
আসিম আহমেদ বলেন, পাকিস্তান বিশ্বাস করে যে দক্ষিণ এশিয়ায় টেকসই শান্তি বজায় রাখতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব এবং কাশ্মীরি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী কাশ্মীর বিরোধের একটি ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি প্রয়োজন। কাশ্মীরি জনগণকে অবশ্যই তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রয়োগের সুযোগ দিতে হবে।
পাকিস্তানি এই দূত আরও বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের বার্ষিক প্রতিবেদনে ফিলিস্তিন ও কাশ্মীর সংকটের মতো দীর্ঘস্থায়ী বিরোধগুলোর প্রাসঙ্গিকতা বারবার ফুটে উঠছে, যা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত এবং এগুলোর সমাধান হওয়া আবশ্যক।
ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে পাকিস্তানি প্রতিনিধি বলেন, ফিলিস্তিনের চলমান ট্র্যাজেডি, বিশেষ করে গাজার পরিস্থিতি নিরাপত্তা পরিষদের এজেন্ডায় শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে রয়েছে। রক্তপাত বন্ধে বারবার ব্যর্থ হওয়ার পর, নিরাপত্তা পরিষদ অবশেষে গাজা শান্তি পরিকল্পনাকে সমর্থন করে ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করেছে, যা আশার আলো দেখাচ্ছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবটি পুরোপুরি এবং বিশ্বস্ততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য।
আসিম আহমেদ আরও যোগ করেন, ১৯৬৭ সালের পূর্বের সীমানার ভিত্তিতে জেরুজালেমকে (আল-কুদস আল-শরিফ) রাজধানী করে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও অখণ্ড ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন এবং ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের প্রতি পাকিস্তানের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে ইসলামাবাদ।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং বিশেষ রাজনৈতিক মিশনগুলোর অপরিহার্য ভূমিকার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত আসিম আহমেদ। তিনি বলেন, পাকিস্তান শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে এবং এ মিশনগুলো যেন কার্যকর, পর্যাপ্ত সম্পদসমৃদ্ধ ও উদীয়মান চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলা করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো একটি অধিকতর গণতান্ত্রিক, প্রতিনিধিত্বশীল এবং জবাবদিহিমূলক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদে ‘ভেটো’ ক্ষমতার ব্যবহার সদস্য দেশগুলোর মধ্যে এখনো একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।
তাই এটি স্পষ্ট যে, নিরাপত্তা পরিষদে একক স্থায়ী সদস্য পদের সম্প্রসারণ এবং ভেটো ক্ষমতার ব্যবহার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অভিন্ন লক্ষ্যের পরিপন্থি।
এ জাতীয় আরো খবর..