✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-০৫, | ২৩:১২:৩৯ |২০১২ সালে বিল গেটসের সঙ্গে এক বৈঠকে তামাক নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন চীনের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সাবেক ধূমপায়ী শি তখন তামাক সেবনকে চীনের অন্যতম বড় সমস্যা বলেও উল্লেখ করেছিলেন। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক সিগারেট যে দেশে পোড়ে, সেই চীনের ধূমপান পরিস্থিতিই ছিল আলোচনার মূল বিষয়।
শি একসময় নিজেও ধূমপায়ী ছিলেন। সে সময় চীনে গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান ড. রে ইপ স্মৃতিচারণ করে বলেন, শি সেদিন জানিয়েছিলেন ধূমপান ছাড়ার পর তিনি অনেক বেশি সুস্থ বোধ করছেন। তামাক সেবনকে চীনের অন্যতম বড় সমস্যা বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ড. ইপের ভাষ্য অনুযায়ী, তামাক নিয়ন্ত্রণে ‘কিছু একটা করার’ প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন শি, যিনি পরের বছর দেশটির প্রেসিডেন্ট হন।
এর কয়েকদিন পর একটি ধূমপানবিরোধী অনুষ্ঠানে বিল গেটসের সঙ্গে দেখা যায় শি জিনপিংয়ের স্ত্রী ও বিখ্যাত গায়িকা পেং লিয়ুয়ানকে। দুজনের পরনেই ছিল ধূমপানবিরোধী স্লোগানসংবলিত লাল শার্ট।
কিন্তু এরপর কেটে গেছে ১৪ বছর। শি জিনপিং এখন কয়েক দশকের মধ্যে চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হলেও তামাক ব্যবহার কমানো কিংবা দেশজুড়ে ইনডোর ধূমপান নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে সিগারেটের বিক্রি কমলেও চীন হেঁটেছে উল্টো পথে।
চীনা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের সাবেক কর্মকর্তাদের প্রতিষ্ঠিত একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চীনে সিগারেটের ব্যবহার ৩৯ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে তা কমেছে ২৬ শতাংশ। বর্তমানে চীনে প্রতি বছর প্রায় ২.৪০ লাখ কোটি সিগারেট বিক্রি হয়, যা বৈশ্বিক মোট বিক্রির প্রায় অর্ধেক।
তরুণদের মধ্যে ধূমপানের হার কমলেও গত ১৩ বছরে দেশটিতে সিগারেট বিক্রি বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এর একটি কারণ তুলনামূলক কম দাম। চীনে এক প্যাকেট সিগারেটের গড় মূল্য প্রায় ৩ ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, সিগারেট বিক্রি কমাতে ব্যর্থ হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে স্টেট টোব্যাকো মনোপলি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের। সংস্থাটি শুধু তামাক শিল্পের নিয়ন্ত্রকই নয়, দেশটির বৃহত্তম সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল টোব্যাকো কর্পোরেশনও তাদের নিয়ন্ত্রণে।
২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা ও কর রাজস্বের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৪৪ বিলিয়ন ডলার। এই অর্থ চীনের জাতীয় রাজস্বের প্রায় ৭ শতাংশ এবং দেশটির ঘোষিত প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় সমপরিমাণ।
চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বর্তমানে মন্থর। দীর্ঘদিনের রিয়েল এস্টেট সংকটের কারণে স্থানীয় সরকারগুলোর আয়ও কমে গেছে। ফলে তামাক খাত থেকে আসা রাজস্ব সরকারের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমনকি শি জিনপিংয়ের একাধিক কৌশলগত অগ্রাধিকার বাস্তবায়নেও এই বিপুল মুনাফা ব্যবহার করা হয়েছে।
গত বছর দেশের আর্থিক খাতকে চাঙা করতে একটি বৃহৎ ব্যাংকে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি ১০০ বিলিয়ন ডলারের জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর বিনিয়োগ তহবিলেরও অন্যতম বড় অর্থদাতা তারা।
এই আর্থিক শক্তিই রাজনৈতিক প্রভাবেও রূপ নিয়েছে। সংস্থাটির প্রধান প্রশাসক সরকারি উপমন্ত্রীর সমমর্যাদাসম্পন্ন। গত সাত বছরে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাতজন সাবেক শীর্ষ প্রশাসক।
২০২২ সালে সংস্থাটি ভেপ শিল্পের ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ভেপ বিক্রির স্থান নির্ধারণ, ফ্লেভারড ভেপ নিষিদ্ধকরণসহ বিভিন্ন কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় চীনে ভেপের প্রসার সিগারেটের চাহিদা কমাতে পারেনি।
২০০৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তামাক নিয়ন্ত্রণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও চীন এখনো এর সবচেয়ে কঠোর বিধানগুলো বাস্তবায়ন করেনি। ২০১৭ সালে দেশব্যাপী ইনডোর ধূমপান নিষিদ্ধ করার দীর্ঘদিনের উদ্যোগও ভেস্তে যায়। এর বাস্তবায়নের দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, যেখানে আইন প্রয়োগ প্রায়ই দুর্বল।
ফলে বর্তমানে দেশটির বহু অঞ্চলে ধূমপানবিষয়ক নিয়ম কার্যত অকার্যকর। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত অনুন্নত এলাকাগুলোতে পরোক্ষ ধূমপান থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা খুবই সীমিত। পশ্চিমা দেশগুলোর সিগারেটের প্যাকেটে যেখানে বড় আকারের স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা থাকে, সেখানে চীনে পান্ডা বা ‘গেট অব হেভেনলি পিস’-এর মতো জাতীয় প্রতীকের পাশে ছোট্ট সতর্কবার্তাই দেখা যায়।
চীনা সিডিসির ২০২২ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, ধূমপান নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার মূল কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত একচেটিয়া তামাক ব্যবসায়ীদের হস্তক্ষেপ এবং তামাক বিষয়ে সরকারের ‘দ্ব্যর্থক মনোভাব’।
করোনা মহামারির পর স্থানীয় পর্যায়ে স্টেট টোব্যাকো মনোপলি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রভাব আরও বেড়েছে। কোভিড মোকাবিলায় বিপুল ব্যয়ের কারণে আর্থিক চাপে পড়া স্থানীয় সরকারগুলোর জন্য তামাক কর রাজস্বের বড় উৎস হয়ে ওঠে। এতে তামাক কোম্পানিগুলোর লবিংও সহজতর হয়েছে।
বেইজিংয়ের ইউনিভার্সিটি অব ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের অধ্যাপক ঝেং রংয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, চীনা উৎপাদনকারীদের প্রতিটি সিগারেট বিক্রি থেকে অর্জিত আয়ের প্রায় অর্ধেকই সরকারি কোষাগারে জমা হয়।
তামাক উৎপাদননির্ভর অঞ্চলগুলোতে এই নির্ভরতা আরও স্পষ্ট। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংয়ের ২০২৪ সালের বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি এসেছে তামাক কর থেকে। মধ্য চীনের চাংদে শহরে ২০২২ সালে কর রাজস্বের ২০ শতাংশই এসেছিল এই খাত থেকে।
এমনকি ক্ষুদ্র ধূমপানবিরোধী উদ্যোগগুলোকেও বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় তামাক ব্যুরোগুলোর বিরুদ্ধে। সরকারি নথি অনুযায়ী, জিয়াংসি প্রদেশের জিনইউ শহরে কিছু জনবহুল এলাকাকে ধূমপানমুক্ত ঘোষণা করার প্রস্তাব দিয়েছিল স্থানীয় স্বাস্থ্য কমিশন। পরে সেই উদ্যোগ সীমিত করার চেষ্টা চালায় স্থানীয় তামাক কর্তৃপক্ষ। তবে জনরোষের মুখে তা সফল হয়নি।
সরকারি উদ্যোগের গতি কমে যাওয়ায় এখন তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে নারীরা নিজ উদ্যোগে ধূমপানবিরোধী প্রচার চালাচ্ছেন। ২৩ বছর বয়সী ইনফ্লুয়েন্সার আলভা ঝাং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক একটি উইচ্যাট গ্রুপ গড়ে তুলেছেন। প্রকাশ্য স্থানে ধূমপায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে ও সচেতনতা বাড়াতে তিনি অনুসারীদের উৎসাহিত করছেন।
আলভা ঝাং বলেন, “কিছু নিয়ম থাকলেও শাস্তির ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। তাই আমি এবং আরও অনেকেই প্রচণ্ড ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব অনুভব করেছি।”
এ ধরনের উদ্যোগে জনসমর্থনও বাড়ছে। অন্যদের প্রতি উদাসীন ধূমপায়ীদের ব্যঙ্গ করে একটি অনুষ্ঠান করার পর এক নারী কমেডিয়ান দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন এবং স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর প্রশংসা পান। সরকারি জরিপেও অনেক নাগরিক ধূমপানবিষয়ক আরও কঠোর নিয়মের পক্ষে মত দিয়েছেন।
ক্ষমতায় আসার পর প্রথমদিকে শি জিনপিং তামাক শিল্পের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবেন বলেই মনে হয়েছিল। ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় সরকার একটি নির্দেশিকা জারি করে, যাতে সরকারি কর্মসূচি ও প্রকাশ্য স্থানে কর্মকর্তাদের ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের ‘দৃষ্টান্তমূলক আচরণ’ প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়।
গেটস ফাউন্ডেশনের সাবেক কর্মকর্তা ড. রে ইপের মতে, এই নির্দেশিকা সম্ভবত সরাসরি শি জিনপিংয়ের কাছ থেকেই এসেছিল। এর ফলে বেইজিংয়ে ইনডোর ধূমপান নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ গতি পায় এবং রাজধানী এ ক্ষেত্রে প্রথম দিকের বড় শহরগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
দুই বছর পর, ২০১৫ সালে তামাকের ওপর কর বাড়ানো হয়। এতে সিগারেটের দাম ১০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়।
তবে একই সময়ে দেশব্যাপী ইনডোর ধূমপান নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ গতি হারাতে শুরু করে। ওই বছরই চীনের ফার্স্ট লেডি পেং লিয়ুয়ানকে শেষবারের মতো প্রকাশ্যে ধূমপানবিরোধী কর্মসূচির পক্ষে কথা বলতে দেখা যায়। ধূমপান ছাড়তে সহায়তাবিষয়ক গবেষণা মূল্যায়নের জন্য সিয়াটলে বিল গেটসের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছিলেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৫ সাল থেকে বিদেশি এনজিওগুলোর ওপর চীনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ ধূমপানবিরোধী আন্দোলনের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। কারণ এসব সংস্থাই ছিল এই প্রচারণার অন্যতম প্রধান অর্থদাতা।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ম্যাথিউ কোরম্যানের মতে, অর্থনৈতিক মন্দা অনেক মানুষকে নিকোটিনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। মানসিক চাপ কমানোর উপায় হিসেবে তারা সিগারেটকে দেখছেন। পাশাপাশি ধূমপানবিরোধী বিধিনিষেধের দুর্বল প্রয়োগ প্রকাশ্যে ধূমপানকে আরও সহজ করে তুলেছে।
মহামারির পর চীনের ন্যাশনাল হেলথ কমিশন তামাক নিয়ন্ত্রণের চেয়ে রোগ নিয়ন্ত্রণে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। যদিও কাগজে-কলমে দেশটির লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ধূমপায়ীর হার ২৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা।
তবে ২০২৪ সালে ন্যাশনাল হেলথ কমিশনের কর্মকর্তা উ জিয়াংতিয়ান স্বীকার করেন, এই লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন। তাঁর ভাষায়, “সত্যি বলতে কী, চাপটা মারাত্মক।”
সূত্র : নিউইয়র্ক টাইমস।