ফুটবল বিশ্বকাপে কিছু ম্যাচ রয়েছে যা ভোলার নয়, কিংবা চাইলেও সহজে ভোলা যায় না। এই যেমন: ২০১৪ সালের সেই সেমিফাইনাল: জার্মানি ভার্সেস ব্রাজিল। ওই ম্যাচে ৭ গোলের সেই বীভৎস স্মৃতি এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে অনেক সেলেসাও ভক্তরা। তবে ওই ঘটনার পর একে একে পার হয়ে গেছে ১২টি বছর। দলে অনেক খেলোয়ার এসেছেন এবং চলে গেছেন।
সামনে এখন ২০২৬ ওয়ার্ল্ড কাপ। অনেক ফুটবল বিশেষজ্ঞ চায়ের টেবিলে আড্ডায় যুক্তি দিয়েছেন, হয়তো এখনই সময়, ব্রাজিলের হেক্সা মিশন সম্পন্ন করার। অনেকে আবার দলের একজন স্টার প্লেয়ার নিয়ে একটু বেশি আবেগি। এই যেমন: নেইমারকে দলে রাখা। তিনিই পারেন এই ডিফেন্সিভলি উইক টিমকে স্বর্ণের সেই শিরোপা এনে দেওয়ার। '১৪ সেমিফাইনালে ব্রাজিলের ডিফেন্সে কিছু লিজেন্ড ছিলেন তাদের মধ্যে দানতে অন্যতম একজন ভিলেন। তিনিই সেই ডিফেন্ডার, যিনি জার্মান ক্লাব উল্ফসবার্গে খেলেছেন এবং ওয়ার্ল্ড কাপের ঠিক পরের বছর, সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ, রবার্ট লেভানডস্কির তাণ্ডবে অনেকটা নিজের ক্যারিয়ার কবর দিয়েছিলেন। ৯ মিনিট। পাঁচ গোল। ইতিহাস। এই সব ট্যাগ ছিল সেই ম্যাচের। সেই ম্যাচ থেকে ধারণা করা যায়, ব্রাজিলের সেই দিন ৭ গোল হজম করার কারণ একরাতে বাজে খেলার ফসল নয়। পরবর্তীতে, দানতে'র মতো ডেভিড লুইজ কিংবা মার্সেলো তাদের ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারবেন না।
কথা হচ্ছে, আনচেলত্তির ব্রাজিল কী এবার পারবে পুরনো মিসটেইক থেকে শিখতে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। একমাত্র দল হিসেবে সবগুলো বিশ্বকাপে অংশ নেয়া সেলেসাওরা পাঁচবার শিরোপা জিতেছে। তবে ২০০২ সালের পর থেকে আর বিশ্বকাপ ট্রফি ছোঁয়া হয়নি তাদের। ২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে রেখে এবার তুলনামূলক কম প্রত্যাশা নিয়েই মাঠে নামছে ব্রাজিল।
তবে কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে দলটিতে এখনও তারকার ছড়াছড়ি। অনেকের মতে, আন্ডারডগে'র তকমা নিয়ে বিশ্বকাপের মিশনে নামা ব্রাজিলের জন্য ইতিবাচকও হতে পারে।
বাছাইপর্বে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর কোচ দরিভাল জুনিয়রকে সরিয়ে, গত বছর, ব্রাজিল বসের দায়িত্ব নেয় ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো বিদেশি স্থায়ী কোচের অধীনে বিশ্বকাপ খেলবে ব্রাজিল।
রিয়াল মাদ্রিদ ও এসি মিলানের হয়ে পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা আনচেলত্তি ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগেই শিরোপা জয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছেন ব্রাজিল দলে। বড় তারকাদের সামলানো এবং বাস্তবসম্মত এবং আত্মবিশ্বাসী দল গঠনে তার সুনাম রয়েছে ব্যাপক।
তবে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে এখনও পুরোপুরি নিজেকে প্রমাণ করতে পারেননি তিনি। এখন পর্যন্ত তার অধীনে ব্রাজিলের ফলাফলও মিশ্র। কলম্বিয়া ও চিলির বিপক্ষে জয় পেলেও মার্চে ফ্রান্সের কাছে ২-১ গোলে হেরেছে দলটি।
২০২৬ বিশ্বকাপে, ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসা হতে পারেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড গতি, ড্রিবলিং ও গোল করার দক্ষতায় প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি।
ক্লাব ফুটবলে দারুণ পারফরম্যান্স করলেও জাতীয় দলে এখনও পুরোপুরি নিজের সেরাটা দিতে পারেননি ভিনি। ব্রাজিলের হয়ে, ৪৩ ম্যাচে, তার গোল মাত্র আটটি। আনচেলত্তি তাকে মেইন স্ট্রাইকার হিসেবে খেলানোর পরিকল্পনা করছেন।
এদিকে, ইনজুরি কাটিয়ে আবারও বিশ্বকাপ দলে ফিরেছেন নেইমার। ব্রাজিলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা এই ফরোয়ার্ড ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর জাতীয় দলের হয়ে খেলেননি। দীর্ঘ সময় ধরে একের পর এক ইনজুরিতে ভুগেছেন তিনি। এরইমধ্যে, কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা একটি প্রতিবেদনে দাবি করেছে, চোটের কারণে বিশ্বকাপে মরক্কোর বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচ মিস করতে পারেন নেইমার জুনিয়র।
সৌদি আরবের অধ্যায় শেষে বর্তমানে ব্রাজিলিয়ান ক্লাব সান্তোসে খেলছেন ৩৪ বছর বয়সী নেইমার। ম্যাচ ফিটনেসের অভাবে মার্চের প্রীতি ম্যাচে তাকে দলে রাখা হয়নি। তবে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে তার অন্তর্ভুক্তি অনেককেই চমকে দিয়েছে।
আনচেলত্তি বলেন, 'সারা বছর আমরা নেইমারকে পর্যবেক্ষণ করেছি। সাম্প্রতিক সময়ে সে নিয়মিত খেলছে এবং শারীরিক অবস্থারও উন্নতি হয়েছে।'
১৯৯৪ সালে, যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের স্মৃতিও অনুপ্রেরণা হতে পারে ব্রাজিলের জন্য। সেবারও ২৪ বছরের অপেক্ষা শেষে বিশ্বকাপ জিতেছিল সেলেসাওরা। এবারও দীর্ঘ শিরোপাখরা কাটানোর স্বপ্ন নিয়েই বিশ্বকাপে যাচ্ছে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা।
ব্রাজিলের অনেক ভক্তই দাবি করেন, গত দশকে ব্রাজিলের শৈল্পিক ফুটবল খেলা হারিয়ে গেছে। স্বাভাবিক। খেলা এখন অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ম্যাচ গুলো এখন অনেক ফিজিকাল। সেই সাথে স্কিল কিংবা স্পিড থাকলেই হবে না, সবকিছুর মধ্যে সামঞ্জস্যতা থাকলেই ভালো করা যাবে। আর এর জলজ্যান্ত উদাহরণ ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। '২২-এর ওয়ার্ল্ড কাপে শুধু মেসিই ভালো খেলেছেন তাই নয়। আল্ভারেজ, এনজো, ডিপল, ডি মারিয়ারা দেখিয়ে দিয়েছে, দলগতভাবে সব কিছুর সমন্বয় করতেই পারলেই সম্ভব সোনালি শিরোপা জেতার। ব্রাজিলকে ঠিক তাই করতে হবে।