ফুটবল ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তির গল্প আছে। আছে অসংখ্য ট্রফি জয়ের স্মৃতি, ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের বিস্ময় আর অগণিত রেকর্ড। কিন্তু ২০০২ সালের বিশ্বকাপে রোনালদো নাজারিওর গল্প ছিল অন্যরকম। সেটি শুধু একটি ফুটবলারের সাফল্যের গল্প নয়, ছিল মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে আবারও বিশ্বজয়ের গল্প।
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে রহস্যময় অসুস্থতা পুরো ফুটবল বিশ্বকে হতবাক করেছিল। সেই ঘটনার ধাক্কা কাটতে না কাটতেই ইন্টার মিলানের জার্সিতে একের পর এক ভয়াবহ হাঁটুর চোট যেন শেষ করে দিচ্ছিল তার ক্যারিয়ার। দুইবার অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকরা পর্যন্ত আশঙ্কা করেছিলেন, হয়তো আর আগের মতো মাঠে ফিরতে পারবেন না তিনি।
চার বছরের দীর্ঘ যন্ত্রণায় রোনালদো হারিয়েছিলেন নিজের গতি, ছন্দ আর স্বাভাবিক জীবনও। মাঠের বাইরে কাটানো প্রতিটি দিন ছিল মানসিক ও শারীরিক সংগ্রামের গল্প। অনেকেই তখন ধরে নিয়েছিলেন, ফুটবল বিশ্ব ‘দ্য ফেনোমেনন’কে শেষবারের মতো দেখেই ফেলেছে।
কিন্তু রোনালদো ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি ছিলেন এমন এক প্রতিভা, যিনি অসম্ভবকে সম্ভব করতে জানতেন। এখনো সর্বকনিষ্ঠ ব্যালন ডি’অর জয়ীর রেকর্ড তার দখলে। তাই সব শঙ্কাকে পেছনে ফেলে বিশ্বকাপের কয়েক মাস আগে যখন তিনি মাঠে ফিরলেন, তখন তার শরীরে ছিল অস্ত্রোপচারের দাগ, আর মনে জমে থাকা ট্রমার পাহাড়।
২০০২ সালের বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই প্রশ্ন উঠেছিল, আগের সেই গতি, ড্রিবলিং আর ধার কি আর ফিরবে? রোনালদো সেই উত্তর দিতে শুরু করেছিলেন প্রথম ম্যাচ থেকেই। পুরো আসরে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে বারবার ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। সাত ম্যাচে করেছিলেন আট গোল। শুধু কোয়ার্টার ফাইনাল ছাড়া প্রতিটি ম্যাচেই জালের দেখা পেয়েছিলেন ব্রাজিলের এই তারকা।
১৯৭৪ সালের পর এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ছয় গোলের যে রেকর্ড অটুট ছিল, সেটিও ভেঙে দেন রোনালদো। আট গোল করে জিতে নেন সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার। পুরো টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষের গোলবার লক্ষ্য করে তার নেওয়া শটের সংখ্যাও ছিল বিস্ময়কর। প্রতিটি ম্যাচেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ইনজুরি তার সামর্থ্যকে একটুও কমাতে পারেনি।
তবে সেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত ছিল ইয়োকোহামার ফাইনাল। একদিকে জার্মানির দুর্ভেদ্য গোলরক্ষক অলিভার কান, যিনি পুরো আসরে প্রায় অপ্রতিরোধ্য ছিলেন। অন্যদিকে পুনর্জন্ম নেওয়া রোনালদো।
সেই ফাইনালে অলিভার কানের সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে দুবার জালে বল জড়ান রোনালদো। তার জোড়া গোলে জার্মানিকে হারিয়ে পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতে ব্রাজিল। গোল করার পর অদ্ভুত সেই অর্ধচন্দ্রাকৃতির চুলের ছাঁট নিয়ে দুই হাত ছড়িয়ে রোনালদোর উদযাপন আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য হয়ে আছে।
চার বছরের যন্ত্রণা, অপারেশন আর অনিশ্চয়তা পেছনে ফেলে যেভাবে রোনালদো আবারও পুরো ফুটবল বিশ্বকে নিজের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য করেছিলেন, সেটিই তাকে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী প্রত্যাবর্তনের প্রতীকে পরিণত করেছে। ২০০২ সালের রোনালদো নাজারিও তাই শুধু একজন বিশ্বকাপজয়ী নন, তিনি ফুটবলের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকা এক পুনর্জন্মের নাম।