ফুটবল ইতিহাসে এমন অনেক দল এসেছে, যাদের নাম শুনলেই মনে হয়েছে ট্রফিটা বুঝি আগেই নির্ধারিত। ২০০৬ সালের ব্রাজিল ছিল ঠিক তেমনই এক দল। বিশ্বজুড়ে কোটি সমর্থক তখন বিশ্বাস করেছিল, শিরোপা ধরে রাখাটা তাদের জন্য শুধুই সময়ের অপেক্ষা।
গোলপোস্টে দিদা, রক্ষণে কাফু, লুসিও আর রবার্তো কার্লোস। মাঝমাঠে জে রবের্তো, এমারসন ও গিলবার্তো সিলভার মতো নির্ভরযোগ্য ফুটবলার। আর আক্রমণভাগে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর চার তারকা রোনালদো, রোনালদিনহো, কাকা ও আদ্রিয়ানো। সেই সময় এই চারজনকে ঘিরেই তৈরি হয়েছিল বিখ্যাত ‘ম্যাজিক কোয়ার্টেট’।
২০০২ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি তখন সদ্য জিতেছে কনফেডারেশন্স কাপ। রোনালদিনহো ব্যালন ডি’অর জয় করে ছিলেন ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে। কাগজে-কলমে ব্রাজিলের সেই দলটিকে প্রায় অজেয় বলেই মনে হচ্ছিল।
কিন্তু ফুটবল শুধু নামের খেলা নয়, সেটি ভারসাম্য আর কৌশলের খেলাও। আর সেখানেই বড় ভুল করেছিলেন কোচ কার্লোস আলবার্তো পাহেইরা। চারজন বিশ্বমানের আক্রমণভাগের ফুটবলারকে একসঙ্গে খেলানোর জন্য তিনি যে রণকৌশল দাঁড় করিয়েছিলেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত দলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হয়।
দলটির আক্রমণভাগ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী, কিন্তু বল ছাড়া খেলায় তাদের অংশগ্রহণ ছিল খুবই কম। রোনালদো, রোনালদিনহো কিংবা কাকার কেউই নিয়মিত নিচে নেমে রক্ষণভাগকে সহায়তা করতেন না। ফলে বল হারানোর পর পুরো আক্রমণভাগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।
এর চাপ গিয়ে পড়ত মাঝমাঠে। প্রতিপক্ষ দ্রুত আক্রমণে উঠলেই মাঝমাঠে বিশাল ফাঁকা জায়গা তৈরি হতো। সেই জায়গা সামলানোর দায়িত্ব নিতে হতো জে রবের্তো ও এমারসনকে। দুই প্রান্তে কাফু ও রবার্তো কার্লোসও তখন ক্যারিয়ারের শেষ ভাগে। আগের মতো দ্রুত ওপরে উঠে আবার রক্ষণে ফিরে আসার শারীরিক সামর্থ্য তাদের আর ছিল না।
মাঠের ভেতরের এই অসামঞ্জস্যের সঙ্গে যোগ হয়েছিল মাঠের বাইরের অনিয়মও। সুইজারল্যান্ডের ওয়েগিসে অনুষ্ঠিত প্রস্তুতি শিবিরে অনুশীলনের চেয়ে প্রচার, স্পন্সর আর উৎসবের আমেজই বেশি চোখে পড়েছিল। খেলোয়াড়দের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও মনোযোগের অভাব ধীরে ধীরে পুরো দলের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।
শেষ পর্যন্ত সেই ভুলের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে। মাকেলেলে ও প্যাট্রিক ভিয়েরার শক্তিশালী মাঝমাঠের সামনে ব্রাজিল পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে জিনেদিন জিদান যেন একাই পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেন।
ম্যাচের একমাত্র গোলটিও আসে ব্রাজিলের মনোযোগহীনতার প্রতীক হয়ে। জিদানের ফ্রি-কিক থেকে থিয়েরি অঁরি যখন একেবারে ফাঁকা অবস্থায় গোল করেন, তখন রবার্তো কার্লোস নিজের অবস্থান ছেড়ে মোজা ঠিক করতে ব্যস্ত ছিলেন।
সব ধরনের প্রতিভা, অভিজ্ঞতা আর তারকাখ্যাতি থাকার পরও ২০০৬ সালের ব্রাজিল শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের অন্যতম হতাশাজনক অধ্যায়ে পরিণত হয়। সেই দলটি মনে করিয়ে দেয়, শুধু বড় বড় নাম থাকলেই বিশ্বকাপ জেতা যায় না। ফুটবলে সফল হতে প্রয়োজন ভারসাম্য, শৃঙ্খলা আর সঠিক পরিকল্পনার।
এ জাতীয় আরো খবর..