সর্বশেষ :
ইরানে ঐক্য দেখে গোটা বিশ্ব বিস্মিত, শত্রুর হিসাব উল্টে গেছে : পেজেশকিয়ান অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম থেকে উঠবেন যেভাবে রক্ত পরীক্ষাতেই জানা যাবে শরীরের কোন অঙ্গ কতটা ‘বুড়িয়ে’ গেছে! ট্রাম্পের ইরান হামলার পর পরমাণু অস্ত্র অর্জনের কথা ভাবছে অনেক দেশ : তেহরান ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন সুনীল গাভাস্কাররা ইরানে গ্যাসের বিপুল মজুত আবিষ্কার, সম্ভাব্য মূল্য ‘দশ বিলিয়ন ডলার’ নভোচারীর ক্যামেরায় ধরা পড়ল আলোর জাদুকরী খেলা লালচে বিড়ালকে পদবি দিল মেট্রো কর্তৃপক্ষ, নাম দিল ‘চিফ ফেলিন অফিসার’ গ্রীষ্মে ফ্রান্সে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৩০১, এক বছরে বেড়েছে ১৪ শতাংশ স্মার্টফোনের ব্যাটারি দ্রুত শেষ হচ্ছে, বন্ধ করুন এই ৫ সেটিংস

রক্ত পরীক্ষাতেই জানা যাবে শরীরের কোন অঙ্গ কতটা ‘বুড়িয়ে’ গেছে!

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-২৪, | ০১:২১:২০ |

মানুষের জন্মতারিখ বলে দেয় তিনি কত বছর ধরে বেঁচে আছেন। কিন্তু একই বয়সে পৌঁছালেও শরীরের সব অঙ্গ যে একই হারে বুড়িয়ে যায়, তা নয়। কারও হৃদযন্ত্র তুলনামূলকভাবে তরুণ থাকতে পারে, অথচ তার মস্তিষ্ক বা অন্য কোনও অঙ্গ বয়সের তুলনায় বেশি বুড়িয়ে যেতে পারে।

নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করেছেন, যা একটি মাত্র রক্তের নমুনা ব্যবহার করে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বয়সের তুলনায় কতটা ‘বয়স্ক’ বা ‘তরুণ’ দেখাচ্ছে, তা অনুমান করতে পারে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাময়িকী ন্যাচার মেডিসিন।

তবে এটি এখনও এমন কোনও রক্ত পরীক্ষা নয়, যা হাসপাতালে গিয়ে সাধারণভাবে করানো সম্ভব। একইভাবে, এটি কোনও অঙ্গের বহু বছরের পরিবর্তন সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে তার বয়স বাড়ার গতি নির্ধারণও করে না। বরং একজন ব্যক্তির প্রকৃত বা কালানুক্রমিক বয়সের তুলনায় তার কোনও অঙ্গ জৈবিকভাবে কতটা বেশি বা কম বয়সী বলে মনে হচ্ছে, সেটিই অনুমান করে।

৯৮৩ মৃত ডোনারের প্রায় ২৬ হাজার টিস্যু নমুনা বিশ্লেষণ
আন্দ্রে রেন্দেইরোর নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে সহ-প্রথম লেখক হিসেবে ছিলেন এরনেস্তো আবিলা, ইভা বুলিয়ান ও ইমিন ঝেং।

গবেষকেরা ৯৮৩ জন মৃত ডোনার ২৫ হাজার ৭১২টি মাইক্রোস্কোপিক টিস্যু ছবি বিশ্লেষণ করেন। এসব নমুনায় ২৯টি অঙ্গের ৪০ ধরনের টিস্যু অন্তর্ভুক্ত ছিল।

বিভিন্ন বয়সের মানুষের টিস্যু নমুনা ব্যবহার করে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মডেলটি টিস্যুর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গঠনগত পরিবর্তন শনাক্ত করতে শেখে, যেগুলো বয়স বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। এভাবেই প্রতিটি অঙ্গের জন্য এক ধরনের ‘টিস্যু ক্লক’ বা টিস্যুভিত্তিক বয়স নির্ধারণের ব্যবস্থা তৈরি করা হয়।

উদাহরণ হিসেবে, ৬০ বছর বয়সী কোনও ব্যক্তির ফুসফুসের টিস্যু যদি এআই মডেলের কাছে আরও বেশি বয়সী মানুষের টিস্যুর মতো মনে হয়, তাহলে ওই ফুসফুসকে তার প্রত্যাশিত বয়সের তুলনায় ‘বয়স্ক’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, মডেলের অনুমান করা বয়স এবং ব্যক্তিদের প্রকৃত বয়সের মধ্যে গড়ে প্রায় পাঁচ বছরের পার্থক্য ছিল।

বয়সের সঙ্গে বদলে যায় অঙ্গের গঠন
গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টিস্যুর এই বয়সের অনুমান শুধু জন্মতারিখের প্রতিফলন বলে মনে হয়নি।

যেসব টিস্যু প্রত্যাশিত বয়সের তুলনায় বেশি বয়স্ক বলে মনে হয়েছে, সেগুলোতে বয়সজনিত বিভিন্ন গঠনগত পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যগত সমস্যার চিহ্নও বেশি দেখা গেছে।

এর মধ্যে ছিল টিস্যু সংকুচিত হয়ে যাওয়া, দাগের মতো শক্ত হয়ে যাওয়া, অতি ক্ষুদ্র রক্তনালির সংখ্যা কমে যাওয়া, কঙ্কালের পেশিতে অতিরিক্ত চর্বি জমা এবং স্নায়ু পাতলা হয়ে যাওয়ার মতো পরিবর্তন।

গবেষকেরা আরও দেখতে পান, মানুষের শরীরের সব অঙ্গ একই ধরনের বার্ধক্যের পথ অনুসরণ করে না। কারও শরীরের একাধিক অঙ্গে বয়সজনিত পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট অঙ্গ- যেমন হৃদযন্ত্র, ফুসফুস বা পাকস্থলী- শরীরের অন্য অঙ্গগুলোর তুলনায় অনেক বেশি বয়স্ক দেখাতে পারে।

রক্তের নমুনা কীভাবে অঙ্গের বয়সের ইঙ্গিত দেয়?
কোনও অঙ্গের জৈবিক বয়স সরাসরি নির্ধারণ করতে সাধারণত সেই অঙ্গ থেকে টিস্যু সংগ্রহ করতে হয়। এটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আক্রমণাত্মক বা ইনভেসিভ প্রক্রিয়া।

এই সমস্যা এড়াতে গবেষকেরা টিস্যুতে নির্ধারিত বয়সের সঙ্গে একই ব্যক্তিদের রক্তের নমুনায় জিনের কার্যক্রমের ধরন মিলিয়ে দেখেন।

সহজভাবে বললে, কোনও অঙ্গ বয়সের তুলনায় বেশি বয়স্ক দেখালে রক্তে তার সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত কার্যক্রমের কোনও নির্দিষ্ট পরিবর্তন আছে কি না, সেটি খুঁজে বের করা হয়।

গবেষণার প্রধান গবেষক আন্দ্রে রেন্দেইরো সায়েন্স অ্যালার্ট-কে বলেন, রক্তের নমুনা সরাসরি কোনও অঙ্গের ছবি তুলে তার বয়স জানায় না। বরং এআই মডেল রক্তে পাওয়া জিনের কার্যক্রমের ধরন এবং অঙ্গের বয়সের পার্থক্যের মধ্যে শেখা সম্পর্ক ব্যবহার করে অঙ্গটির বয়সের অনুমান করে।

এরপর গবেষকেরা দ্বিতীয় একটি মডেল তৈরি করেন, যা শুধু রক্তের তথ্য ব্যবহার করে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ কতটা বয়স্ক দেখাচ্ছে, তা অনুমান করতে পারে।

এই মডেলের পূর্বাভাস সবচেয়ে ভালো কাজ করেছে শরীরের সামগ্রিক বার্ধক্য, পরিপাকতন্ত্র এবং প্লীহার ক্ষেত্রে।

রোগ অনুযায়ী অঙ্গের বয়সের পার্থক্য
গবেষকেরা দেখতে চেয়েছেন, রক্ত থেকে পাওয়া এই বয়সের অনুমান বাস্তব রোগের সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত। এ জন্য তারা সুস্থ মানুষের পাশাপাশি আট ধরনের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তের তথ্য বিশ্লেষণ করেন।

দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত অঙ্গগুলোকে মডেল সাধারণত প্রত্যাশিত বয়সের তুলনায় বেশি বয়স্ক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

যেসব ব্যক্তি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের বয়সের পার্থক্য সবচেয়ে বেশি ছিল।

ক্রোনস রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে খাদ্যনালি, পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্রে তুলনামূলক বেশি বয়সের পার্থক্য দেখা যায়।

অন্যদিকে, আলঝেইমার রোগীদের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বয়সের পার্থক্য পাওয়া যায় শুধু মস্তিষ্কে।

গবেষকদের মতে, এসব ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে শরীরের গভীরে কোনও অঙ্গে কী ঘটছে, তার কিছু সূত্র রক্তে পাওয়া যেতে পারে।

তবে কোনও অঙ্গকে জৈবিকভাবে বেশি বয়স্ক দেখালেই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না যে দ্রুত বার্ধক্যই ওই রোগের কারণ। বরং রোগটি নিজেই অঙ্গের বয়স বাড়িয়ে দিতে পারে, অথবা বার্ধক্য ও রোগ- দুটি প্রক্রিয়া একই সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে।

আগেও রক্ত দিয়ে অঙ্গের বয়স মাপার চেষ্টা হয়েছে
রক্তের মাধ্যমে অঙ্গের বয়স অনুমানের ধারণা একেবারে নতুন নয়। এর আগে কিছু গবেষণায় রক্তে ঘুরে বেড়ানো বিভিন্ন প্রোটিনের মাত্রা পরিমাপ করে অঙ্গের জৈবিক বয়স অনুমানের চেষ্টা করা হয়েছে।

এমনই একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, যাদের মস্তিষ্ক জৈবিকভাবে বেশি বয়স্ক বলে মনে হয়, তাদের মৃত্যুঝুঁকিও বেশি হতে পারে।

তবে বাজারে থাকা বিভিন্ন বাণিজ্যিক ‘বায়োলজিক্যাল এজ’ বা জৈবিক বয়স নির্ণায়ক পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য দেখা যেতে পারে। ফলে শুধু একটি পরীক্ষার ফলের ওপর ভিত্তি করে কারও স্বাস্থ্য বা ভবিষ্যৎ রোগঝুঁকি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া এখনও সম্ভব নয়।

গবেষণাটির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে
নতুন গবেষণাটির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশ্লেষণ করা অধিকাংশ টিস্যুই মৃত ব্যক্তিদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। ফলে একই ব্যক্তিকে জীবিত অবস্থায় বহু বছর ধরে অনুসরণ করে তার অঙ্গের বয়স কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা গবেষকেরা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারেননি।

এছাড়া রক্তভিত্তিক পদ্ধতিটি মূলত এমন ব্যক্তিদের মধ্যে মূল্যায়ন করা হয়েছে, যাদের ইতোমধ্যে কোনও রোগ শনাক্ত হয়েছিল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- কোনও রোগের উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই এই পদ্ধতি দিয়ে রোগের ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব কি না। এ বিষয়ে এখনও নিশ্চিত কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

গবেষকদের মতে, ক্লিনিক্যাল ব্যবহারে যাওয়ার আগে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে একই ফল পাওয়া যায় কি না, উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই এটি রোগ শনাক্ত করতে পারে কি না এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়া যায় কি না- এসব বিষয়ও নিশ্চিত হতে হবে।

রেন্দেইরোর মতে, বাস্তব চিকিৎসায় এই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য ‘বাস্তবসম্মতভাবে কয়েক বছর, সম্ভবত প্রায় এক দশক’ সময় লাগতে পারে।

গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আবিলা, বুলিয়ান, ঝেং ও রেন্দেইরো জানিয়েছেন, এ গবেষণার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পেটেন্টে তাদের আর্থিক স্বার্থ রয়েছে।

বয়স শুধু একটি সংখ্যা নয়
গবেষণাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো- মানুষের জৈবিক বয়সকে একটি মাত্র সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা হয়তো শরীরের প্রকৃত অবস্থার পুরো চিত্র তুলে ধরে না।

একই শরীরে থাকা হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক, ফুসফুস, পাকস্থলী বা কিডনি একই গতিতে বুড়িয়ে যায় না। কোনও একটি অঙ্গ হয়তো বয়সের তুলনায় অনেক বেশি বয়স্ক, আবার অন্যটি তুলনামূলকভাবে তরুণ থাকতে পারে।

ভবিষ্যতে যদি রক্তের একটি সাধারণ নমুনা থেকেই এসব অঙ্গের জৈবিক বয়স সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়, তাহলে তা রোগের ঝুঁকি শনাক্তকরণ ও ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। তবে সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি যাচাই প্রয়োজন। সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..