✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-২২, | ১৯:৩৩:২৬ |দেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে বিদ্যমান সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করার আশ্বাস দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়। তাই ব্যবসা-বাণিজ্যের পথে বাধা যত গভীরই হোক, তা দূর করা হবে।
শনিবার রাজধানীতে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ডিরেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার কথা বলা যতটা সহজ, বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করা ততটাই কঠিন। তবে সরকার এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একটি ওয়েবসাইট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট একদিনে সমাধান করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে তিন মাসের রিজার্ভ নিশ্চিত করার জন্য সরকার কাজ করছে। চলমান মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি বিল পরিশোধে সরকারের অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সব ধরনের জ্বালানি উৎসের মধ্যে সমন্বয় করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তবে প্রাথমিকভাবে সৌরশক্তির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ খাতে বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, সরকার ইতোমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে পারলে উদ্যোক্তারা ঋণ সহায়তা পাবেন। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য হবে না।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর আওতায় উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি, দক্ষতা বৃদ্ধি, পণ্যের নকশা ও বাজারজাতকরণে সহায়তা দেওয়া হবে। পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি থেকে দেশকে গণতান্ত্রিক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিতে সরকার কাজ করছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, কর-জিডিপির অনুপাত না বাড়াতে পারলে সরকারের কোনো উদ্যোগই সফল হবে না। এজন্য কর ব্যবস্থাপনায় অটোমেশনের কোনো বিকল্প নেই। একইসঙ্গে অর্থায়নের বিকল্প উৎস বাড়াতে পুঁজিবাজার শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি বন্ড চালুর বিষয়ও সরকার সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। তিনি বলেন, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৩ দশমিক ১ শতাংশ ধরা হয়েছে। বাণিজ্য বাধা, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, সরবরাহব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে।
দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘসময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। সরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ মাত্র ৫ শতাংশ। বিনিয়োগের জন্য এটি উদ্বেগজনক। দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজার শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন তিনি।
তাসকীন আহমেদ বলেন, রপ্তানিতে লিড টাইম কমাতে শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে দেশের লজিস্টিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করা প্রয়োজন।
সিএমএসএমই খাতে ঋণপ্রবাহের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, লক্ষ্যমাত্রার ২৫ শতাংশের বিপরীতে প্রকৃত ঋণপ্রবাহ ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে আটকে আছে। ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এ খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ২৪ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। প্রচলিত জামানতনির্ভর ঋণের পরিবর্তে ডিজিটাল স্কোরিংয়ের মাধ্যমে ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি কেনার জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সৌরচালিত সেচব্যবস্থায় বিনিয়োগের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ চালু, জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারের প্রস্তাব দেন ডিসিসিআই সভাপতি।
সেমিনারে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতি একটি যুগসন্ধিক্ষণে রয়েছে। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসবে, আর ভুল হলে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। করজাল সম্প্রসারণে হয়রানি কমানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
খেলাপি ঋণ কমাতে কাঠামোগত সমস্যা সমাধান এবং এসএমই খাতে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান হোসেন জিল্লুর রহমান। অর্থনৈতিক সংস্কারের বাস্তবায়ন তদারকিতে ‘ইকোনমিক রিফর্ম এক্সিলারেশন ইউনিট’ গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি।
আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় নামেনি। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দীর্ঘদিনের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। উচ্চ সুদহার, উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিময় হার এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে। বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন বাড়াতে স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
পিআরআই চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার বলেন, দেশের নীতিমালা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। উচ্চ শুল্কহারের কারণে স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এলডিসি উত্তরণের জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সিপিডির সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এডিপি বাস্তবায়ন করতে হলে কর আহরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। বাজেটে ভালো উদ্যোগ থাকলেও মুদ্রানীতিতে তার যথাযথ প্রতিফলন নেই। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির সংস্কার জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সেমিনারের মুক্ত আলোচনায় ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি হোসনে খালেদ রিয়েল এস্টেট খাতকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানান। সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান দেশের কয়লার মজুত কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের প্রস্তাব দেন। সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান করজাল সম্প্রসারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন এবং এসএমই খাতের জন্য পৃথক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বরাদ্দের প্রস্তাব করেন।
অনুষ্ঠানে ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহসভাপতি মো. সালিম সোলায়মান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।