✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-২৩, | ০০:৪৮:২৫ |মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের লাগাতার হামলার কারণে সুয়েজ খালের সামুদ্রিক চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে দ্রুত পণ্য পরিবহনের বিকল্প হিসেবে উত্তর মেরু (আর্কটিক) রুটের প্রতি নতুন করে আগ্রহ জন্মেছে শিপিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বরফমুক্ত থাকার সুবাদে এই পথ দিয়ে যাতায়াতের পরীক্ষা চালাচ্ছেন অনেকে। তবে শিল্প বিশেষজ্ঞরা এই রুটের বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো যথেষ্ট সন্দিহান। তাদের মতে, বিভিন্ন দেশের কৌশলগত উচ্চাশা ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের সঙ্গে এই রুটের প্রকৃত বাণিজ্যিক উপযোগিতার বাস্তবতার আকাশ-পাতাল ফারাক রয়েছে।
চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার কন্টেইনারবাহী জাহাজগুলো রুশ জলসীমায় অবস্থিত উত্তর সমুদ্রপথ (নর্দার্ন সি রুট বা এনএসআর) ব্যবহার করে পরীক্ষামূলকভাবে চলাচল করার উদ্যোগ নিয়েছে। ক্রেডিট ইন্স্যুরেন্স গ্রুপ কোফাসের গত এপ্রিল মাসের তথ্য অনুযায়ী, সুয়েজ খালের তুলনায় এই রুট দূরত্ব ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিয়ে আনতে পারে এবং আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে আসার দীর্ঘ পথচলার তুলনায় তা প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনতে পারে। কিন্তু স্প্রেডশিটে বা কাগজে-কলমে এই হিসাব যতটাই চমৎকার দেখাক না কেন, মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়নে রয়েছে বিশাল সব প্রতিবন্ধকতা।
ফরাসি ইনস্টিটিউট অফ মেরিটাইম ইকোনমিকস-এর পরিচালক পল টুরেট জানান যে আর্কটিক অঞ্চলের এই যোগাযোগ কেবল বছরের একটি নির্দিষ্ট ঋতুতে, অর্থাৎ আগস্ট থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত সচল রাখা সম্ভব। তাছাড়া এই রুটের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত আইস-ক্লাস বা বরফ প্রতিরোধী জাহাজের প্রয়োজন হয়, যেগুলোর পরিচালনা খরচ সাধারণ জাহাজের তুলনায় অনেক বেশি। এর ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের একটা বিশাল অংশ দখল করে থাকা প্রকাণ্ড আকৃতির কন্টেইনার জাহাজগুলোর পক্ষে এই পথ ব্যবহার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, কারণ এই বিশাল জাহাজগুলোই অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে সেবা দিয়ে থাকে। তুলনামূলকভাবে, এই মাসে চীনের নিংবো বন্দর থেকে ইউরোপের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া 'দুবাই টাওয়ার' কন্টেইনার জাহাজের ধারণক্ষমতা প্রচলিত বড় জাহাজগুলোর মাত্র দশভাগের একভাগ।
উত্তর সমুদ্রপথে চলাচলকারী বেশিরভাগ জাহাজকেই রাশিয়ার শক্তিশালী পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসবেকার বা বরফ ভাঙার জাহাজের নিরাপত্তাবেষ্টনীতে চলতে হয়। বীমা প্রতিষ্ঠান অ্যালিয়ান্স কমার্শিয়ালের সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, গত বছর রেকর্ড সংখ্যক মাত্র ২৩টি জাহাজ এই পথ পাড়ি দিয়েছিল, যা সুয়েজ খালের দৈনিক ট্রাফিকের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত চলাকালীনও চলতি বছরের প্রথমার্ধে সুয়েজ খাল দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৫টি জাহাজ যাতায়াত করেছে, যা হুতিদের আক্রমণ শুরুর আগের দৈনিক ৫০টিরও বেশির তুলনায় কম হলেও আর্কটিকের তুলনায় অনেক বেশি।
কোফাসের অর্থনীতিবিদ ইভ বারের মতে, পূর্ব এশিয়া, উত্তর ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার মধ্যকার বর্তমান বাণিজ্যের মাত্র ৩.৫ শতাংশ এই আর্কটিক রুটে স্থানান্তরিত হতে পারে। আগামী ২০৩০ সাল পর্যন্ত এর কার্যকারিতা অত্যন্ত সীমিত থাকবে এবং এটি মূলত কাঁচামাল, অপরিশোধিত তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মতো নির্দিষ্ট পণ্যের পরিবহনেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। তবে অতিরিক্ত সামুদ্রিক ট্রাফিক আর্কটিক অঞ্চলের পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। জাহাজ থেকে নির্গত কালচে ধোঁয়া বরফের স্তরের ওপর জমে সূর্যালোকের তাপ শোষণকে বাড়িয়ে দেয়, যা বরফ গলা প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুততর করতে পারে। এ ছাড়া জ্বালানি তেল সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকায় ফ্রান্সের সিএমএ-সিজিএম, সুইজারল্যান্ডের এমএসসি এবং জার্মানির হাপাগ-লয়েড-এর মতো শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি পশ্চিমা শিপিং কোম্পানি ইতিমধ্যেই এই রুট ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সূত্র: গালফ নিউজ