দক্ষিণ আমেরিকার রাজনীতিতে ২০২৬ সালের কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর চার বছরের শাসনের পর ক্ষমতায় এসেছেন ডানপন্থী ও ট্রাম্প-সমর্থিত আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা। নির্বাচনের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সরকারের জন্য প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের নিরাপত্তা সহায়তা দেয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
একটি নির্বাচন, একজন নতুন প্রেসিডেন্ট এবং একটি বড় মার্কিন নিরাপত্তা সহায়তা, এই তিনটি ঘটনাকে আলাদা করে দেখলে বিষয়টি যতটা সাধারণ মনে হয়, বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখলে চিত্রটি অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
পেত্রো থেকে দে লা এসপ্রিয়েলা:
গুস্তাভো পেত্রো ছিলেন কলম্বিয়ার ইতিহাসের প্রথম বামপন্থী প্রেসিডেন্ট। তার সরকারের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক প্রকল্প ছিল বিভিন্ন সশস্ত্র ও অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সহিংসতা কমানোর চেষ্টা।
কিন্তু এই নীতির ফল নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আলোচনার সুযোগ দেয়ার ফলে কিছু এলাকায় তাদের শক্তি ও প্রভাব বেড়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষও বাড়ে।
অন্যদিকে পেত্রো সরকারের সমর্থকদের বক্তব্য ছিল, কয়েক দশকের সামরিক সংঘাতের সমস্যাকে শুধুমাত্র সামরিক শক্তি দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয় এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য আলোচনার প্রয়োজন।
এই বিতর্কের মধ্যেই ২০২৬ সালের নির্বাচন মূলত একটি প্রশ্নে পরিণত হয়:
কলম্বিয়া কি পেত্রোর বামপন্থী ও শান্তি-আলোচনা নির্ভর পথ অব্যাহত রাখবে, নাকি আবার কঠোর নিরাপত্তা ও ডানপন্থী নীতিতে ফিরে যাবে?
শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় পথটিই জয়ী হয়। দে লা এসপ্রিয়েলা রান-অফ নির্বাচনে বামপন্থী প্রার্থী ইভান সেপেদাকে মাত্র ০.৯৬% ভোটের অল্প ব্যবধানে পরাজিত করেন।
দে লা এসপ্রিয়েলার সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
দে লা এসপ্রিয়েলা ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর প্রকাশ্য সমর্থনও পেয়েছিলেন। কারণ পেত্রোর সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত টানাপোড়েনপূর্ণ। মাদকবিরোধী নীতি, অভিবাসন, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং ভেনেজুয়েলা সহ বিভিন্ন প্রশ্নে দুই সরকারের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল।
দে লা এসপ্রিয়েলা শক্তিশালী বিরোধী অপরাধ এবং মাদকবিরোধী এজেন্ডা নিয়ে নির্বাচনে যান, যা তার রাজনৈতিক অবস্থান ওয়াশিংটনের বর্তমান নিরাপত্তা অগ্রাধিকারের সঙ্গে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
এ কারণেই তাঁর বিজয়কে শুধু কলম্বিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা পড়ে না।
তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়াতে এত আগ্রহ কেন?
এর উত্তর একাধিক স্তরে রয়েছে।
১. ভৌগোলিক অবস্থান: কলম্বিয়া দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। দেশটির ক্যারিবিয়ান সাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগর, দুই দিকেই সমুদ্রসীমা রয়েছে এবং পানামার সঙ্গে সরাসরি সীমান্ত রয়েছে। ফলে কলম্বিয়া হলো দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কলম্বিয়ার সম্পর্কের ইতিহাসও দীর্ঘ। এমনকি ১৯০৩ সালে পানামা কলম্বিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনায় ওয়াশিংটনের ভূমিকা ছিল, যা পরবর্তীতে পানামা খাল নির্মাণের পথ খুলে দেয়। অর্থাৎ কলম্বিয়ার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব নতুন কোনো বিষয় নয়।
২. মাদক ও নিরাপত্তা: কলম্বিয়া দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মাদকবিরোধী কার্যক্রমের অংশীদারদের একটি দেশ। ২০০০ সালের পর থেকে ওয়াশিংটন কলম্বিয়াকে মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যাপক সহায়তা দিয়েছে। এখন দে লা এসপ্রিয়েলা ক্ষমতায় এসে আরও কঠোরভাবে মাদক পাচার এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই নীতির সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের নিরাপত্তা অগ্রাধিকারের যথেষ্ট মিল রয়েছে। সুতরাং ২০২৬ সালের $১ বিলিয়ন নিরাপত্তা সহায়তাকে এই দীর্ঘ নিরাপত্তা সম্পর্কের ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখা যায়।
৩. কলম্বিয়া একটি বড় অর্থনৈতিক অংশীদার:এখানে শুধু ভূ-রাজনীতি নয়, সরাসরি অর্থনৈতিক স্বার্থও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কলম্বিয়া লাতিন আমেরিকাতে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০১২ সালে কার্যকর হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-কলম্বিয়া বাণিজ্য উন্নয়ন চুক্তি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে।
৪. ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গ: কলম্বিয়ার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় ভেনিজুয়েলার কারণে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ ২,২০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। ভেনিজুয়েলার স্থায়ীভাবে ওয়াশিংটনের সাথে বিরোধপূর্ণ সম্পর্কে রয়েছে, আবার চীন ভেনিজুয়েলার কৌশলগত অংশীদার।
৫. চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা: ২০২৪ সালে ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে মোট সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল ১৮৮.৯২ বিলিয়ন ডলার, এর ৩৮% অর্থ প্রায় ৭১.৮ বিলিয়ন ডলার এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। অন্যদিকে, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত চীন লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে প্রায় ১৪৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে এবং ২০০৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত হিসাবে চীনা অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের মূল্য ছিল প্রায় ৬৮.৬ বিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশ জ্বালানি ও পরিবহন খাতে এসেছে। এটি হয়তো ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। গুস্তাভো পেট্রোর সময় কলম্বিয়া চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছিল এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে সহযোগিতা পরিকল্পনাও এগিয়েছিল। ওয়াশিংটন স্বাভাবিকভাবেই লাতিন আমেরিকা-চীনা অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধিকে বিবেচনায় রাখে। তাই কলম্বিয়াকে ঘনিষ্ঠ মার্কিন অংশীদার হিসাবে ধরে রাখা শুধু কলম্বিয়ার সাথে বন্ধুত্ব নয়; এটি দক্ষিণ গোলার্ধে মার্কিন প্রভাব বজায় রাখার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসাবে দেখা যায়।
১ বিলিয়ন ডলার কেন এত তাৎপর্যপূর্ণ?
এটিকে তিনটি স্তরে দেখা যায়:
১. প্রথমত - নিরাপত্তা: মাদক পাচার ও সশস্ত্র অপরাধী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কলম্বিয়াকে শক্তিশালী করা।
২. দ্বিতীয়ত - কূটনীতি: নতুন কলম্বিয়ান সরকারকে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। ফলে নতুন প্রেসিডেন্ট অভিষিক্ত হবার সাথে সাথে আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর ও চিলির প্রেসিডেন্টের সাথে সাথে ফিফার বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এসপ্রিয়েলার সঙ্গে দেখা করেছেন।
৩. তৃতীয়ত - আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি: ভেনিজুয়েলা, ক্যারিবিয়ান এবং বৃহত্তর লাতিন আমেরিকাতে মার্কিন প্রভাব রাখা।
আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর ও চিলির নেতারা কেন গুরুত্বপূর্ণ
দে লা এসপ্রিয়েলার রাজনৈতিক উত্থানকে লাতিন আমেরিকার বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। আর্জেন্টিনার জাভিয়ের মিলেই, ইকুয়েডরের ড্যানিয়েল নোবোয়া এবং চিলির হোসে আন্তোনিও কাস্টের মতো রক্ষণশীল বা ডানদিকে ঝুঁকে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে দে লা এসপ্রিয়েলার নিজস্ব অবস্থানের বেশ কিছু মিল রয়েছে। ফলে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক মিত্রের সমাবেশ ঘটবে যাদের প্রতি নেতানিয়াহুর সমর্থন রয়েছে।
তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্র কলম্বিয়ার নির্বাচন প্রভাবিত করেছে?
এটাই সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্ন। ট্রাম্প প্রকাশ্যে দে লা এসপ্রিয়েলাকে সমর্থন করেছেন, এটি প্রতিষ্ঠিত তথ্য। ফলে তাঁর সমর্থন অবশ্যই নির্বাচনী প্রচারণার রাজনৈতিক পরিবেশে প্রভাব ফেলেছে।
এর ফলে ভোটারদের একটি অংশের কাছে এই বার্তা পৌঁছেছে যে, দে লা এসপ্রিয়েলা ক্ষমতায় এলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কলম্বিয়ার কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হতে পারে। বিশেষ করে পেত্রো সরকারের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের টানাপোড়েনের বিপরীতে, দে লা এসপ্রিয়েলা নিজেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের একটি বিকল্প রাজনৈতিক পথ হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন।
এ জাতীয় আরো খবর..