জ্বালানি তেল, মূল্যস্ফীতি ও এআই বিনিয়োগে বিশ্বজুড়ে ঋণ বাবদ খরচ ঊর্ধ্বমুখী

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-২২, | ১৪:৪৬:১৮ |
বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোয় দীর্ঘমেয়াদি ঋণের খরচ ফের বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও জাপানের মতো দেশে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণের সুদহার সাম্প্রতিক সময়ে নতুন উচ্চতায় উঠেছে।

এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া উদ্বেগ, সরকারের ঋণের পরিমাণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগ। বিবিসির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে আসে।


প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণ বাবদ খরচ বাড়ার প্রভাব শুধু সরকার বা বড় কোম্পানির ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের ঋণ নেয়ার খরচেও। বাড়ি কেনার ঋণ বা মর্টগেজ, গাড়ির ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদ, সবই এর কারণে বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ব্যবসার জন্য ঋণ নেয়াও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পণ্যের দাম ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে গত মঙ্গলবার ৩০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদহার বেড়ে ৫ দশমিক ৩৩ শতাংশে উঠেছে। ২০০৭ সালের জুনের পর এটি সর্বোচ্চ। যুক্তরাজ্যেও দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণের সুদহার বেড়ে হয়েছে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। জার্মানি ও জাপানের বাজারেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।

সরকারি বন্ডের সুদহারকে সাধারণভাবে ‘ইয়েল্ড’ বলা হয়। বন্ড হলো এক ধরনের ঋণপত্র। সরকার বা কোম্পানি অর্থ সংগ্রহের জন্য বন্ড বিক্রি করে। বিনিয়োগকারীরা সে বন্ড কিনে অর্থ দেন। এর বিনিময়ে নির্দিষ্ট হারে সুদ পান। ফলে বন্ডের ইয়েল্ড বাড়লে নতুন করে অর্থ ধার করার খরচও বাড়ে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বন্ড ইয়েল্ড বাড়ার সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে উঠেছে জ্বালানি তেলের দাম। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ঘিরে অনিশ্চয়তা বাড়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ব্রেন্ট হলো বিশ্ববাজারে তেলের দামের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সম্পর্ক সরাসরি। পরিবহন থেকে শুরু করে উৎপাদনসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই জ্বালানি তেলের ব্যবহার রয়েছে। পণ্য পরিবহনে ট্রাক, লরি ও ভ্যানের ব্যবহার ব্যাপক। ফলে তেলের দাম বেড়ে গেলে পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। সে বাড়তি ব্যয় অনেক সময় কোম্পানিগুলো পণ্যের দামে যোগ করে। এতে বাজারে পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যেতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি ফের বেড়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ওপর সুদহার বাড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত সুদহার বাড়ায়। এতে ঋণ নেয়ার খরচ বাড়ে ও অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ কিছুটা কমে। এর মাধ্যমে চাহিদা কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়।

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি জ্বালানি তেলের বাজারে এ নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা ও অঞ্চলটির সংঘাত ঘিরে নৌপথটির কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সরবরাহে বাধা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিনিয়োগকারীরা।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান বিশ্লেষক জন ক্যানাভান বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি, সরকারের উচ্চ ঋণ ও এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগসহ সব মিলিয়েই ঋণের খরচ বাড়ছে। বিশেষ করে এআই খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হলেও সে অর্থ কত দ্রুত ফেরত আসবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।’

তার মতে, এর প্রভাব ভোক্তাদের ওপরও পড়তে পারে। বন্ডের ইয়েল্ড বাড়লে ব্যাংক ও অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ দেয়ার খরচ বাড়তে পারে। ফলে বাড়ি কেনার ঋণ, গাড়ির ঋণসহ বিভিন্ন ধরনের ঋণের সুদহারও বাড়ার আশঙ্কা থাকে। এতে পরিবারগুলোর মাসিক ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কোম্পানিগুলোর জন্যও পরিস্থিতি সহজ নয়। ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন কারখানা স্থাপন বা প্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরির জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত ঋণ নেয়। সুদহার বেড়ে গেলে এসব ঋণের খরচ বাড়ে। তখন কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারে অথবা বাড়তি খরচ পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি আর্থিক নীতি নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সরকারগুলো কত ঋণ নিচ্ছে ও ভবিষ্যতে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করবে, এসব বিষয় এখন বন্ডবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, কিছু দেশের আর্থিক অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে টেকসই থাকবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি ও জাপানে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের খরচ সবচেয়ে বেশি বাড়ছে। এসব দেশের ক্ষেত্রে সরকারি অর্থ ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন মাত্রায় উদ্বেগ রয়েছে।

এআই খাতের বিপুল বিনিয়োগও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন বলছে, গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে কোম্পানিগুলোর ঋণ নেয়ার গতি রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। এসব ঋণের বড় একটি অংশ যাচ্ছে এআই ও ডেটা সেন্টার তৈরির কাজে।

এআই প্রযুক্তি নিয়ে বড় ধরনের বিনিয়োগ চলছে বিশ্বজুড়ে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ডেটা সেন্টার, কম্পিউটিং অবকাঠামো ও অন্যান্য প্রযুক্তিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। কিন্তু এসব বিনিয়োগ থেকে কত দ্রুত আয় আসবে, তা স্পষ্ট নয়। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

বোকেহ ক্যাপিটাল পার্টনার্সের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা কিম ফরেস্ট বলেন, ‘বন্ডের ইয়েল্ড বৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করছে। কারণ এর অর্থ হলো অর্থের জোগান আরো কঠিন হয়ে উঠছে ও ঋণ নেয়া ব্যয়বহুল হচ্ছে। বিশেষ করে, এআই খাতে বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত পেতে কত সময় লাগবে, তা অনিশ্চিত। এ কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা বাড়ছে।’

সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির সামনে এখন কয়েকটি চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি ফের বাড়ছে এবং সরকারগুলোর ঋণও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। একই সময় এআই ও ডেটা সেন্টারে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে। এসব কারণে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে বেশি সুদ দাবি করছেন। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে অর্থের খরচ আরো বাড়তে পারে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..