বিশ্বকাপের সেরা ফ্যান কি তারাই?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-০৭, | ১৯:৫৫:০৪ |

মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা, মায়ামি হয়ে কানসাস সিটি; গত তিন সপ্তাহ ধরে কলম্বিয়ার বিশ্বকাপ যাত্রা যত উত্তরের দিকে এগিয়েছে, গ্যালারিতে ততই বেড়েছে হলুদ জার্সির জোয়ার। এবার সেই ‘হলুদ জ্বর’ আছড়ে পড়তে চলেছে কানাডায়। দীর্ঘ ১২ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে মঙ্গলবার ভ্যাঙ্কুভারে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হচ্ছে নেস্টর লরেঞ্জোর শিষ্যরা। আর প্রিয় দলকে জোগাতে ভ্যাঙ্কুভারের রাস্তায় এখন হাজার হাজার কলম্বিয়ান সমর্থকের ঢল।

সমর্থকদের এমন অভূতপূর্ব দেশান্তর শেষবার দেখা গিয়েছিল ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে। দীর্ঘ এক প্রজন্ম পর সেবার কলম্বিয়া বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়ায় এবং ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে ব্রাজিলে লাখো সমর্থক ছুটে গিয়েছিলেন। এবারের আসরে দলের অধিনায়ক হিসেবে উত্তর আমেরিকায় আসার আগে তারকা ফুটবলার হামেস রদ্রিগেস সমর্থকদের সংযত ও ইতিবাচক থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন, কারণ ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে কিছু বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। রদ্রিগেস আশ্বস্ত করেছিলেন যে খেলোয়াড়রা মাঠে তাদের সবটুকু ঢেলে দেবেন এবং গ্যালারির এই ইতিবাচক শক্তি তাদের মাঝেও সংক্রামিত হয়।

চলতি বিশ্বকাপে রদ্রিগেস মাঠের পারফরম্যান্সে হয়তো এখনো পুরোপুরি চেনা ছন্দে ফিরতে পারেননি। ঘানার বিপক্ষে শেষ বত্রিশের ম্যাচে প্রথমার্ধের পরেই তাকে তুলে নেওয়া হয়। তবে তার অনুপস্থিতিতে দলের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছেন লুইস দিয়াস, যিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাদের অবিশ্বাস্য বলে আখ্যা দিয়েছেন। কানসাস সিটির মতো কলম্বিয়ান জনসংখ্যা কম থাকা শহরেও ম্যাচের আগের রাতে হোটেলের বারান্দায় এসে ফুটবলারদের গান গেয়ে শোনান ভক্তরা, এতে খেলোয়াড়রা বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।

কলম্বিয়ার ম্যাচ দেখতে আসা ৫৪ বছর বয়সী হুয়ান কার্লোস মিলা জানান, এটি তার জীবনের প্রথম বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতা। পুরো পরিবার নিয়ে মেক্সিকো সিটিতে প্রথম ম্যাচ দেখার পর তারা একটি মিনিভ্যান ভাড়া করে আমেরিকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে প্রায় সাত হাজার মাইল পাড়ি দিয়েছেন। যাতায়াত ও হোটেলের খরচ মেটাতে মিলার উদ্যোক্তা সন্তানরা স্টেডিয়ামের বাইরে কলম্বিয়ার ঐতিহ্যবাহী টুপি, টি-শার্ট ও পতাকা বিক্রি করছেন। শুধু তাই নয় পুরো পরিবারকে একসঙ্গে ফুটিয়ে তুলতে তারা ছয় মিটার লম্বা একটি বিশাল পতাকা তৈরি করেছেন, যাতে ছয়টি মাথা গলানোর ছিদ্র রয়েছে এবং সেখানে লেখা ‘কলম্বিয়া বিশ্বকাপ ২০২৬’।

গ্যালারিতে কলম্বিয়ানদের এই গগনবিদায়ী চিৎকার প্রতিপক্ষ দলগুলোকে রীতিমতো ভড়কে দিচ্ছে। মায়ামিতে ম্যাচের আগে পর্তুগালের কোচ রবের্তো মার্তিনেস স্বীকার করেছিলেন যে এত বিপুল সংখ্যক কলম্বিয়ান সমর্থকের সামনে খেলাটা তাদের জন্য সবচেয়ে বড় মানসিক চ্যালেঞ্জ ছিল। অন্যদিকে ঘানার কোচ কার্লোস কুইরোজ, যিনি একসময় কলম্বিয়া দলের দায়িত্বে ছিলেন, ম্যাচ হেরে আক্ষেপ করে বলেন যে স্টেডিয়ামের ৬০ হাজার হলুদ জার্সির গর্জন জাতীয় সংগীতের সময় থেকেই তাদের অনভিজ্ঞ দলকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দিয়েছিল। কলম্বিয়ার এই 'দ্বাদশ খেলোয়াড়' তাদের জয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে।

তবে এই বিশ্বকাপ উম্মাদনার মাঝেও দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কলম্বিয়ার জার্সি নিয়ে কিছুটা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্বকাপের শুরুর সময়টাই ছিল দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ। ডানপন্থী নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আবেলর্দো দে লা এস্প্রিয়েয়া নির্বাচনী প্রচারণায় কলম্বিয়ার জার্সি পরে হাজির হলে তার বামপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ইভান সেপেদা এর তীব্র সমালোচনা করেন এবং ফুটবলকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ তোলেন। যদিও পরবর্তীতে ফুটবল ফেডারেশন এ বিষয়ে কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সেপেদা নিজেও জার্সি পরে প্রচারণায় নামেন।

রাজনৈতিক বিতর্ক যাই থাক না কেন, ফুটবল যে পুরো কলম্বিয়াকে এক সুতোয় গেঁথেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভ্যাঙ্কুভার স্টেডিয়ামে মঙ্গলবারের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেও গ্যালারি জুড়ে থাকবে কেবলই হলুদের জয়জয়কার। সমর্থক হুয়ান কার্লোস মিলার কথায়, খেলোয়াড়রা মাঠে তাদের জীবন বাজি রেখে লড়বেন আর গ্যালারি থেকে কোটি ভক্তের প্রার্থনা ও ভালোবাসা তাদের সেই শক্তি জোগাবে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..