✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-০৭, | ১৫:৫৩:৩৩ |বয়স কেবল একটি সংখ্যা—এই প্রবাদটি প্রমাণ করলেন মিশরের ৮৩ বছর বয়সী আমাল ইসমাইল। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত, পারিবারিক দায়িত্ব, মরণব্যাধি ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই এবং দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে তিনি অর্জন করেছেন কাঙ্ক্ষিত পিএইচডি (ডক্টরেট) ডিগ্রি। তার এই সাফল্য কেবল একটি একাডেমিক অর্জন নয়, বরং অধ্যবসায়, সাহসিকতা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অসাধারণ আখ্যান।
সম্প্রতি মিশরের মানসুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদে অনুষ্ঠিত থিসিস ডিফেন্সে সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি এই বিরল গৌরব অর্জন করেন। বিচারক প্যানেল তার গবেষণার বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক গুরুত্ব বিবেচনায় তাকে বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেন। একই সঙ্গে তার গবেষণাপত্রটি প্রকাশ এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিময়ের জন্য সুপারিশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
গবেষণার বিষয়বস্তু ও প্রাসঙ্গিকতা:
আমাল ইসমাইলের গবেষণার শিরোনাম ছিল ‘সক্রিয় বার্ধক্য এবং কিছু সমাজতাত্ত্বিক চলকের সঙ্গে এর সম্পর্ক: মানসুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত কিছু কেস স্টাডি’। মজার ব্যাপার হলো, তার গবেষণার বিষয়টি ছিল তার নিজের জীবনেরই প্রতিফলন। মিশরের দাকাহলিয়া গভর্নরেটের বিভিন্ন গ্রামের ২০ জন প্রবীণ নারীর ওপর তিনি দীর্ঘ গবেষণা চালিয়েছেন। তার মূল লক্ষ্য ছিল প্রবীণদের জীবন, তাদের সামাজিক চ্যালেঞ্জ এবং কীভাবে সক্রিয় বার্ধক্য নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
সংগ্রামের দীর্ঘ পথ:
দাকাহলিয়া গভর্নরেটের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া আমাল ইসমাইলের শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল প্রতিকূল। তৎকালীন সময়ে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকলেও বাবার উৎসাহে তিনি মানসুরার একটি ফরাসি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু মাত্র ১৪ বছর বয়সে থাইরয়েডের জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তার পড়াশোনায় প্রথম ছেদ পড়ে। একই বছর বিয়ের পিঁড়িতে বসার পর তিনি দীর্ঘ সময় সংসার ও সন্তান লালন-পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
৩৮ বছর বয়সে পুনরায় পড়াশোনায় ফেরার অদম্য ইচ্ছায় তিনি মাধ্যমিকের প্রাথমিক স্তরের সনদ অর্জন করেন। কিন্তু স্বামীর ইচ্ছায় পরবর্তী ৩০ বছর তিনি নিজেকে পুরোপুরি পারিবারিক দায়িত্বের জন্য উৎসর্গ করেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি মরণব্যাধি ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হয়েছেন, যা তার মানসিক শক্তিকে আরও সুদৃঢ় করে।
সাফল্যের চূড়ান্ত ধাপ:
২০১১ সালে নিজের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের অণুপ্রেরণায় তিনি নতুন করে শিক্ষাজীবনে ফিরে আসেন। ৭০ বছর বয়সে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়ে ৮৩ শতাংশ নম্বর নিয়ে উত্তীর্ণ হওয়া ছিল তার সাফল্যের অন্যতম মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। এরপর মানসুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদে ভর্তি হয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে ৮৩ বছর বয়সে তিনি পৌঁছে গেলেন ডক্টরেটের শিখরে।
মানসুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তার এই অর্জনের প্রশংসা করে বলেন, “আমাল ইসমাইল কেবল একজন শিক্ষার্থী নন, তিনি প্রতিটি প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার বাতিঘর।”
আমাল ইসমাইলের এই গল্প বিশ্বব্যাপী সেই সব মানুষের জন্য আশার আলো, যারা মনে করেন স্বপ্নের পেছনে ছোটার জন্য নির্দিষ্ট বয়সের প্রয়োজন। দৃঢ় সংকল্প ও ধৈর্য থাকলে যে কোনো বয়সেই নতুন ইতিহাস লেখা সম্ভব, তা আবারও প্রমাণ করলেন এই অদম্য নারী।