ছররা গুলিতে অন্ধদের যন্ত্রণা নিয়ে ব্যঙ্গ, অজয়ের নতুন ছবি ঘিরে তোলপাড়

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-০৭, | ১৫:২৫:৪৫ |

কাশ্মীরে পেলেট গুলির আঘাতে দৃষ্টিশক্তি হারানো মানুষের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা ও ট্র্যাজেডিকে উপহাস করার অভিযোগ উঠেছে অজয় দেবগন অভিনীত নতুন বলিউড চলচ্চিত্র ‘চৌহান’-এর বিরুদ্ধে। ২০২৭ সালের অক্টোবরে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা ছবিটির টিজার প্রকাশের পর থেকেই মানবাধিকার কর্মী, বিশ্লেষক এবং ভুক্তভোগীদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, টিজারে অজয় দেবগনকে একজন ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তার ভূমিকায় দেখা যায়, যিনি কাশ্মীরের পাথর নিক্ষেপকারী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছেন। ট্রেইলারে দাবি করা হয়, আগের ভারতীয় সরকারগুলো বিক্ষোভকারীদের প্রতি নরম অবস্থান নিয়ে ‘শত্রুদের লালন-পালন’ করেছে। একই সঙ্গে ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলা হয়, টিয়ার গ্যাস থেকে রক্ষা পেতে অনলাইনে মাস্ক কেনা সম্ভব হলেও পেলেট গান বা ছররা গুলি কেবল ‘সীমিত ক্ষতি’ করে।

তবে এই উপস্থাপনাকে বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত বলে উল্লেখ করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। ২০১০ সালে কাশ্মীরে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে প্রথম পেলেট গান ব্যবহার শুরু করে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী। এরপর থেকে এক হাজারের বেশি মানুষ এই অস্ত্রের আঘাতে আংশিক বা সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।

বিশেষ করে ২০১৬ সালে হিজবুল মুজাহিদিনের কমান্ডার বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ দমনে ব্যাপকভাবে পেলেট গান ব্যবহার করা হয়। সে সময় নারী, শিশু এবং তরুণসহ শত শত মানুষের চোখে মারাত্মক আঘাত লাগে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি পেলেট কার্টিজ থেকে শত শত ধাতব কণা বেরিয়ে মানুষের শরীর ও চোখে ঢুকে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো এত গভীরে প্রবেশ করে যে অস্ত্রোপচার করেও বের করা সম্ভব হয় না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আহতদের ১৪ শতাংশের বয়স ছিল ১৫ বছরের নিচে।

পেলেট গুলিতে দুই চোখ হারানো ২৮ বছর বয়সী ফিরোজ আসলাম (ছদ্মনামে) আল জাজিরাকে বলেন, নির্মাতারা যদি একদিনের জন্যও নিজেদের চোখ বেঁধে রাখতেন, তাহলে অন্ধত্বের কষ্ট বুঝতে পারতেন। তাঁর ভাষায়, অসহনীয় যন্ত্রণায় অনেক সময় মৃত্যুর কথাও মনে হয়। এখনো তাঁর বৃদ্ধ বাবা দর্জির কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন।

২০১৬ সালে দৃষ্টিশক্তি হারানো আরেক ভুক্তভোগী মসরুর খালিদ বলেন, তাঁর মুখে এখনো ৩০০টির বেশি ধাতব কণা রয়ে গেছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সেগুলো অপসারণের চেষ্টা করলে পুরো মুখ বিকৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চলচ্চিত্র কাশ্মীরে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপকে বৈধতা দেওয়ার একটি নতুন প্রচেষ্টা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট-এর প্রধান রকিব হামিদ নায়েক বলেন, ২০১৪ সালের পর থেকে ঘৃণাভিত্তিক রাজনৈতিক বয়ানকে কেন্দ্র করে বলিউডের একটি অংশ লাভজনক ব্যবসার সুযোগ দেখছে। তাঁর মতে, এ ধরনের চলচ্চিত্র যেমন বাণিজ্যিকভাবে সফল হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, তেমনি সরকারি সমর্থনও পায়।

২০১৯ সালে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর দ্য কাশ্মীর ফাইলস, আর্টিকেল ৩৭০, বারামুল্লাসহ একাধিক চলচ্চিত্র সরকারের পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার মেডিকেল অ্যানথ্রোপলজিস্ট সাইবা ভার্মা বলেন, আগে পেলেট গানকে তুলনামূলক কম প্রাণঘাতী অস্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এখন সেই অবস্থানও আর বজায় রাখা হচ্ছে না। তাঁর মতে, ট্রেইলারে রক্তাক্ত চোখের কাশ্মীরি তরুণদের যেভাবে দেখানো হয়েছে, তা কাশ্মীরিদের হিংস্র ও বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার পুরোনো ইসলামবিদ্বেষী বয়ানেরই অংশ।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বহুবার কাশ্মীরে শিশু ও বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে পেলেট গান ব্যবহার বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, নতুন এই চলচ্চিত্র সেই বিতর্কিত অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাকে বিনোদনের উপাদানে পরিণত করেছে।

সূত্র: আল জাজিরা

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..