✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-০২, | ১৩:৫৯:০১ |মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইরান। গতকাল রোববার এসব হামলায় অন্তত তিন মার্কিন সেনা নিহত ও পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এই তথ্য নিশ্চিত করেছে বলে আলজাজিরা জানিয়েছে।
ইসরায়েলের শহর বেইত শেমেশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কমপক্ষে ৯ জন নিহত হয়েছেন। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে হামলা চালিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই দাবি অস্বীকার করেছে।
খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার কথা জানিয়ে আইআরজিসি বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটির ২৭ জায়গায় ও তেল আবিবে ইসরায়েলি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ২৪টি প্রদেশে শত্রু বাহিনীর হামলায় কমপক্ষে ২০১ ইরানি নিহত হয়েছেন। ৭৪৭ জন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে রেড ক্রিসেন্ট। ইরানও প্রতিশোধমূলক কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, সৌদি আরব, ইরাক, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে ইসরায়েল এবং মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর হামলা অব্যাহত রাখার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ও স্থাপনায় হামলা চলবে। গতকাল টেলিভিশনে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন। পেজেশকিয়ান বলেন, সর্বোচ্চ নেতার পদাঙ্ক আমরা অনুসরণ করে যাব। শত্রুদের সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করতে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী কঠোর আঘাত হানতে থাকবে। বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাহাদাত ছিল বছরের পর বছর চলে আসা ত্যাগের চূড়ান্ত পরিণতি।
ইরানের এই হুমকির জবাব দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলে হামলা হলে এমন আঘাত করব, যা আগে দেখা যায়নি। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন শক্তি ব্যবহার করারও হুমকি দেন।
ট্রাম্প নিজ সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে লেখেন, ‘ইরান মাত্রই বলেছে তারা অত্যন্ত কঠোরভাবে আক্রমণ চালাবে। তারা এত জোরালো হামলা চালাবে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। তবে তাদের এমনটা না করাই ভালো। কারণ যদি তারা এটা করে, তাহলে আমরা এমন শক্তি ব্যবহার করে তাদের আঘাত করব, যা আগে কখনও দেখা যায়নি।’
এ ছাড়া ইরানে এক দিনে এক হাজার ২০০টির বেশি বোমা হামলা চালানোর দাবি করেছে ইসরায়েল। অন্যদিকে, ইসরায়েলের বেইত শেমেশ এলাকায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে আটজনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় ২৭ জন আহত হয়েছে, তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক জানিয়েছে আলজাজিরা। গতকাল জেরুজালেমের ৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে ইসরায়েলের ওই এলাকায় ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে হামলা চালিয়েছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর এই হামলা চালানো হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানিয়েছে, মার্কিন বিমানবাহী রণতরী আব্রাহাম লিংকনে চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন জানুয়ারির শেষ থেকে আরব সাগরে অবস্থান করছে। ইরানে হামলা চালাতে এই অঞ্চলে সামরিক শক্তি জোরদার করার পরিকল্পনা থেকে এই রণতরী আনে ওয়াশিংটন।
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা শুরুর ঘোষণা ইরানের
এদিকে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বোমা হামলার প্রতিবাদে তারা ষষ্ঠ দফার পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। বিপ্লবী গার্ড এক বিবৃতিতে বলেছে, আইআরজিসি ইসরায়েল এবং এ অঞ্চলের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ‘ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন’ হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসির দাবি, এ অভিযানে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটির পাশাপাশি ইসরায়েলের তেল নফ বিমানঘাঁটি, তেল আবিবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কমান্ড সদরদপ্তর ‘হাকিরিয়া’ ও একটি বিশাল প্রতিরক্ষা শিল্প কমপ্লেক্সে আঘাত হানা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানি বাহিনী পর্যায়ক্রমে ‘অনুশোচনামূলক চপেটাঘাতের’ মাধ্যমে প্রতিশোধের আরও একটি ভিন্ন ও ‘কঠোর পদক্ষেপ’ বাস্তবায়ন করবে।
ইরানের হামলায় ইসরায়েলে নিহত বেড়ে ৮
ইসরায়েলের বেইত শেমেশ এলাকায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে আটজনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় ২৭ জন আহত হয়েছে, তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানানো হয়েছে। ইসরায়েলের জরুরি সেবা বিভাগ এ তথ্য জানিয়েছে। এই হামলার কথা স্বীকার করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। গতকাল জেরুজালেমের ৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে ইসরায়েলের ওই এলাকায় ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তেল আবিবে একাধিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েল তাদের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে ইরানের হামলা প্রতিহত করার চেষ্টা করছে।
তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় ‘ভয়াবহ’ বিস্ফোরণ
ইরানের রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা হয়েছে। এসব এলাকায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানায়, তেহরানের বিভিন্ন এলাকা, বিশেষ করে সাইয়্যেদ খানদান, কাসর চত্বর, ভানাক স্কয়ার এবং মোতাহারি স্ট্রিট এলাকার আশপাশে ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। এর আগেও তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে বড় ধরনের বিমান হামলা হয়েছে। ইসরায়েলের বিমানবাহিনী দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ অভিযানে তারা ইরানে এক হাজার ২০০টির বেশি বোমা ফেলেছে। আলজাজিরা জানায়, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় নিহত বেড়ে ১৪৮ জনে দাঁড়িয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, এই হামলার জবাব দেওয়া হবে।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের হামলা
রয়টার্স জানায়, আইআরজিসি সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কয়েক দশক ধরে এ বিমানঘাঁটি মার্কিন বাহিনী ব্যবহার করে আসছে। ইরাকের আলুহারির বিমানঘাঁটিতেও হামলা করেছে। এই ঘাঁটিতেও মার্কিন বাহিনীর সদস্যরা রয়েছে।
কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ প্রধান আবদুল্লাহ খলিফা আলুমুফতাহ জানিয়েছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে দেশটিতে আটজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। টেলিভিশন ভাষণে তিনি জানান, কাতারের দিকে অন্তত ৬৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। ইরানের হামলায় বাহরাইনের রাজধানী মানামায় ক্রাউন প্লাজা হোটেলে হামলা হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাই ও কাতারের দোহায় নতুন করে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দুবাইয়ে কমপক্ষে ১১টি বিস্ফোরণ ঘটেছে। এর আগে কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইরানের হামলায় দেশটিতে আরও আটজন আহত হয়েছেন। হামলা শুরুর পর থেকে কাতারে আহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
সিএনএন জানায়, আমিরাতের রাজধানী আবুধাবির জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরানি ড্রোন হামলায় একজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও সাতজন। কুয়েতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটিতে বিস্ফোরণে এক ব্যক্তি নিহত ও ৩২ জন আহত হয়েছেন। এর আগে কুয়েতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়।
জরুরি বৈঠকে বসেছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের পাল্টা হামলার ঘটনায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি বৈঠকে বসেছে। এতে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই সামরিক পদক্ষেপ এমন এক ধারাবাহিক ঘটনার সূচনা করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত কারও নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। বিশ্বের সবচেয়ে অস্থিতিশীল অঞ্চলটিতে এ ঝুঁকি অত্যন্ত গুরুতর বলেও মন্তব্য করেন তিনি।