উত্তর-পূর্বে মেঘনা, পশ্চিমে তেতুলিয়া আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ঘেরা প্রকৃতির এক স্বর্গরাজ্য দ্বীপজেলা ভোলা। 'কুইন আইল্যান্ড অব বাংলাদেশ'নামেও পরিচিত জেলাটি। লঞ্চে স্বস্তির ভ্রমণ আর স্বল্প খরচে খুব কাছ থেকে প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে পবিত্র ঈদুল ফিতরের লম্বা ছুটিতে শহরের কোলাহল ছেড়ে পরিবার, স্বজন ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে এই দ্বীপজেলার যেসব স্থান ঘুরে আসতে পারেন।
বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল গ্রন্থাগার ও স্মৃতি যাদুঘর
ভোলা সদর উপজেলার আলীনগরে ইউনিয়নে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামালের স্মৃতিবিজরিত বাসস্থান ও তার নামে সরকারিভাবে স্থাপিত যাদুঘর। শহরের ওয়েষ্টানপাড়া থেকে জনপ্রতি ২০ টাকা অটোরিকশা ভাড়ায় চলে যেতে পারবেন আলীনগর সাহেবের কাচারীতে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল গ্রন্থাগার ও স্মৃতি যাদুঘরে, যাদুঘরে রয়েছে এ বীরের ব্যবহৃত নানা জিনিসপত্র ও বইপত্র। পাশেই তার পরিবার নিবাস রয়েছে। সেখানে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে দেওয়া যাবে।
মেঘনা-তেতুলিয়া পাড়
এ জেলার মূল আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে উত্তাল মেঘনা তেতুলিয়ার গর্জন করে বয়ে চলা। রয়েছে একপাশে নদী আরেকপাশে বসতি৷ নদী তীরের বেড়িবাঁধের ধুলোমাখা পথে নির্মল বাতাস উপভোগ করতে করতে হাটতে পারবেন মন যতদুর চায়। এ ছাড়া, দেখা মিলবে মেঘনা তেতুলিয়া নদীর জল-ছেকে জেলেরা স্রোতের ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরার দৃশ্য। ভোলা শহর থেকে জনপ্রতি ৩০-৫০ টাকার খরচে যাওয়া যাবে মেঘনা তেতুলিয়ার পাড়ে।
ইলিশ বাড়ি ও আলাপন
মেঘনা নদীর তীরে তুলাতুলিতে অবস্থিত ভাসমান ইলিশ বাড়ি ও আলাপন রেষ্টুরেন্টে জনপ্রতি ২০ টাকা টিকেটে প্রবেশ করে মেঘনার নির্মল বাতাস আর মেঘনার গর্জন দেখতে পাবেন পানির উপর ভাসমান থেকে, যা ভিন্ন এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জন হবে। এসব রেষ্টুরেন্টে ভালো মানের সব ধরনের খাবার পাওয়া যায়।
ড্রিমল্যান্ড
ভোলা শহরে থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে সার্কিট হাউজের সামনে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন ড্রিমল্যান্ড পার্কটি।
৩০ টাকা টিকেটে ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন এবং ভেতরে কায়াকিংসহ নানা উপভোগ্য জিনিস রয়েছে, তবে সেজন্য আলাদা টিকেট কাটতে হবে।
স্বাধীনতা যাদুঘর ও মোঘল আমলের মসজিদ
ভোলার উপশহর বাংলাবাজারে রয়েছে রয়েছে স্বাধীনতা যাদুঘর। যেখানে দেখা মিলবে মহান মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতিচিহ্ন। এ ছাড়া, যাদুঘর থেকে কিছুটা দূরে রয়েছে প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো মোঘল আমলের পরিত্যক্ত একটি মসজিদ। এটি দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নে একটি সুপারি বাগানের মধ্যে অবস্থিত। যা দেখতে প্রতিদিনই ভীর করেছে দর্শনার্থীরা। এসব স্থানে প্রবেশে কোনো টিকেট লাগে না। শহর থেকে এ দুটি স্থানে যেতে চাইলে জনপ্রতি ভাড়া পড়বে সর্বোচ্চ ২০০-২৫০ টাকা।
বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল ইকোপার্ক
দৌলতখান উপজেলা শহর থেকে শহর থেকে ২০ টাকা রিকশা ভাড়ার দূরত্বে ঘুরে আসতে পারেন মেঘনা নদীর তীরে নির্মিত বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল ইকোপার্কে। এটির অবস্থান ভবানীপুর ইউনিয়নে।
জমিদার বাড়ি
ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় রয়েছে দুটি জমিদার বাড়ি। মূলত এ উপজেলাটির নামকরণ করা হয়েছিল জমিদার বোরহানউদ্দিনের নামানুসারে। উপজেলার উত্তর বাসস্ট্যান্ড থেকে অটোরিকশায় চড়ে যাওয়া যাবে বোরহানউদ্দিন জমিদার বাড়িতে ও আব্দুল জব্বার মিয়া জমিদার বাড়িতে। সেখানে দেখা মিলবে তাদের কয়েকশত বছরের পুরোনো জমিদারির জরাজীর্ণ স্মৃতিচিহ্ন।
বেতুয়া-মেরিন ড্রাইভ
মেঘনা নদীর তীরে চরফ্যাশন উপজেলায় রয়েছে বেতুয়া প্রশান্তি পার্ক। সেখান থেকেই শুরু হয়েছে মেরিন ড্রাইভ খ্যাত দৃষ্টিনন্দন বেড়িবাঁধ, বেড়িবাঁধের একধারের সবুজ গাছ আর অন্যপাশের মেঘনার গর্জন, যা দেখতে প্রতিদিনই সেখানে ভির জমাচ্ছে দর্শনার্থীরা।
জ্যাকব টাওয়ার (চরফ্যাশন টাওয়ার)
চরফ্যাশনে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোবৃহৎ ওয়াচ টাওয়ার জ্যাকব টাওয়ার (চরফ্যাশন টাওয়ার)। জনপ্রতি ১০০ টাকা টিকেটে টাওয়ারের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠে দেখতে পাবেন ফ্যাশন স্কয়ারসহ চোখ যতদূর যায় ততদূর পর্যন্ত নয়াভিরাম প্রকৃতির দৃশ্য।
কুকরিমুকরি ও ঢালচর
চরফ্যাশন উপজেলা শহর থেকে ভেঙে ভেঙে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরের দক্ষিণ আইচা কচ্ছপিয়া ঘাটে গিয়ে সেখান থেকে ছোট লঞ্চে ও স্পিটবোটে চড়ে যেতে পারবেন কুকরিমুকরি ও ঢালচরের তারুয়া সমুদ্র সৈকতে। সেখানে থাকার জন্য রয়েছে রিসোর্ট, হোমস্টে সার্ভিস ও বঙ্গোপসাগরে তীরে তাবুতে ক্যাম্পেইন করার সুবিধা। (এসবের ভাড়া দামাদামি করে নিতে হবে)।
যেখানে একসঙ্গে দেখা মিলবে বিশাল ম্যানগ্রোভ বন। বার্ড ওয়াচ টাওয়ার, ভাগ্য ভালো হলে বনে দেখা মিলবে হরিণের। তারুয়া সমুদ্র সৈকতে লাল কাকড়ার অবাধ বিচরণ, অতিথি পাখির দলবদ্ধ উড়াউড়ি, দেখা যাবে সুর্যোদয় ও সুর্যাস্ত ও আরেকপাশে বিস্তীর্ণ বন।
মনপুরা
ছবির মতোই সুন্দর ভোলার এ বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলাটি। হাজিরহাটের পাশেই রয়েছে মেঘনার তীরে দৃষ্টিনন্দন হাজিরহাট ল্যান্ডিং স্টেশন, পায়ে হেঁটে ১০ মিনিটের মধ্যেই সেখানে পৌঁছানো যায়। সেখানে গেলে আপনাকে স্বাগত জানাতে সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে 'মনপুরায় স্বাগতম, এবং খোদা হাফেজ'। এ ছাড়া, সেখানে গিয়ে ধারণা পাবেন দ্বীপের মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্বাহের সম্পর্কে। ল্যান্ডিং স্টেশনে দাঁড়িয়ে দেখা যাবে সুর্যোদয় ও সুর্যাস্ত আর নদীর মাঝখানের চরে বীরদর্পে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ম্যানগ্রোভ বন। মোটরসাইকেল যোগে চলে যেতে পারবেন চারাবাগান ও ঝাউবনে। যেতে যেতে পথের একপাশে দেখা মিলবে বসতি, অন্যপাশে মেঘনার গর্জন আর মাথার ওপর নীল আকাশে মেঘের ছোটাছুটি।
আসা যাওয়া ও থাকা খাওয়া
ঈদ উপলক্ষে আসা-যাওয়ায় মিলবে ২৪ ঘণ্টার বিলাসবহুল লঞ্চ সার্ভিস সুবিধা। জেনে নিন ভোলার কোথায় কীভাবে যাবেন। ঢাকার সদরঘাট থেকে দ্বীপজেলার ভোলার সব উপজেলাগামী লঞ্চ ছাড়ে। এসব লঞ্চে জনপ্রতি ডেক টিকেট ৪০০-৫০০ টাকা। সিঙ্গেল কেবিল ১২০০ টাকা এবং ডাবল কেবিল ২ হাজার ২০০ টাকা। ফের একই ভাড়ায় ফেরা যাবে।
এ ছাড়া, জেলার প্রতিটি উপজেলাতেই রাত্রিযাপনের জন্য রয়েছে ভালো মানের একাধিক হোটেল। এসব হোটেলে স্টান্ডার্ড সিঙ্গেলের ভাড়া ১৭০০ থেকে ২ হাজার টাকা, ডিলাক্স ডাবল ২৮০০ থেকে ৩ হাজার হাজার টাকা, দামাদামি করে নিতে পারবেন।
ভাড়ার সঙ্গে পাবেন সবার নাস্তা ফ্রি। প্রতিটি হোটেলের রয়েছে নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। কেউ যদি হোটেলে দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবার খেতে চান সেক্ষেত্রে আলাদা বিল দিতে হবে। অর্ডার দিলে খাওয়ার টেবিলে দ্বীপজেলার জিআই পন্য ইলিশ ও মইষা টক দইসহ নানা রকমের দেশি মাছ পাবেন। এ ছাড়া, শহরের মধ্যে আরও বেশ কিছু কমদামের থাকার হোটেল রয়েছে, খোঁজ করলে সহজেই পেয়ে যাবেন।
এ জাতীয় আরো খবর..