বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল মানেই প্রকৃতির এক অপরূপ লীলাভূমি। এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ বিষাদ। এখানকার বাতাস নোনা, মাটি নোনা, এমনকি মানুষের বেঁচে থাকার গল্পটাও নোনাজলের সঙ্গে একাকার। জলবায়ু পরিবর্তনের রূঢ় বাস্তবতায় উপকূলের নারীরা আজ এক অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। বিশেষ করে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি এখানে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে; যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
নোনাজলে জীবন, নোনাজলে মরণ
উপকূলের নারীদের দিন শুরু হয় জীবনযুদ্ধের এক কঠিন সমীকরণ দিয়ে। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট কিংবা ভোলার মতো জেলাগুলোয় জীবিকার প্রধান উৎস চিংড়ি ঘের বা নদীতে মাছ ধরা। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই অঞ্চলের প্রায় ৫০ শতাংশ নারী তাদের দিনের বেশির ভাগ সময়ই পানিতে কাটান।
পরিবারের অন্ন সংস্থানের জন্য কিশোরী বয়স থেকেই অনেককে নামতে হয় চিংড়ির পোনা ধরার কাজে। কোমর সমান নোনাপানিতে দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকা তাদের রুটিন। এই দীর্ঘ সময় নোনাপানিতে নিম্নাংশ ভিজিয়ে রাখার ফলে তাদের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর নেমে আসছে ভয়াবহ বিপর্যয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলছে?
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘসময় লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকার ফলে নারীর যোনিপথ ও জরায়ুর স্বাভাবিক জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে দেখা দেয় দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ বা ক্রনিক ইনফেকশন।
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত নোনাপানি জরায়ুমুখে ক্ষত সৃষ্টি করে। এটি পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজের ঝুঁকি বাড়ায়। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ এবং সংক্রমণ জরায়ুমুখ ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে।
মাসিককালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সুপেয় পানির অভাব
উপকূলীয় জনপদে সুপেয় পানির সংকট তীব্র। গোসল, কাপড় ধোয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার জন্য নারীরা বাধ্য হয়ে লবণাক্ত ও দূষিত পানি ব্যবহার করেন। এর প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে মাসিকের দিনগুলোয়।
দারিদ্র্য এবং সচেতনতার অভাবে স্যানিটারি ন্যাপকিন অনেক নারীর কাছেই বিলাসিতা। তারা পুরোনো কাপড় ব্যবহার করেন এবং লজ্জায় সেই কাপড় পরিষ্কার করেন পুকুর বা খালের নোনাপানিতে। অপরিচ্ছন্ন ও আর্দ্র এই কাপড় ব্যবহারে জীবাণু দ্রুত বংশবিস্তার করে, যা জরায়ু সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অবহেলায় ফেলে রাখা এ সংক্রমণই পরে ক্যান্সার-পূর্ব অবস্থায় রূপ নেয়।
জরায়ু কেটে ফেলা
লবণাক্ততাপ্রবণ গ্রামগুলোয় জরায়ুসংক্রান্ত অসুখের তীব্রতা এতই বেশি, অনেক নারী অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে অল্প বয়সেই জরায়ু কেটে ফেলতে বাধ্য হন। এটি কেবল শারীরিক ক্ষতিই নয়, ডেকে আনছে সামাজিক বিপর্যয়ও।
জরায়ু কেটে ফেলার পর অনেক নারীর সংসার ভেঙে যাচ্ছে। স্বামীরা তাদের পরিত্যাগ করে দ্বিতীয় বিয়ে করছেন, যা সমাজে অস্থিরতা তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণের মূল কারণ (লবণাক্ততা ও অপরিচ্ছন্নতা) দূর না করে জরায়ু কেটে ফেলা দীর্ঘ মেয়াদে কোনো সমাধান নয়, বরং এটি নারীর হরমোনজনিত ভারসাম্য নষ্ট করে এবং উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
উপকূলীয় নারীর মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত কম। অনিয়মিত স্রাব, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব বা তলপেটে ব্যথাকে তারা ‘স্বাভাবিক নারীজনিত সমস্যা’ ভেবে উপেক্ষা করেন। যখন তারা চিকিৎসকের কাছে যান, তখন রোগটি অনেক ক্ষেত্রে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। স্ক্রিনিং বা ভায়া টেস্টের অপ্রতুলতা এই ঝুঁকিকে আরও উস্কে দিচ্ছে।
সমাধানের পথ
উপকূলীয় নারীর এই নীরব মহামারি থেকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। কেবল চিকিৎসা নয়, প্রয়োজন জীবনযাত্রার পরিবর্তন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় কিছু পদক্ষেপ জরুরি– ১. সুপেয় পানির নিশ্চয়তা: নারীর ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার জন্য সুপেয় বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের টেকসই ব্যবস্থা করতে হবে। ২. নিরাপদ মাসিক ব্যবস্থাপনা: স্যানিটারি ন্যাপকিন সহজলভ্য করা এবং কিশোরীদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানো। ৩. বিকল্প কর্মসংস্থান: নারীকে নোনাপানির কাজ থেকে বিরত রাখতে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা। ৪. নিয়মিত স্ক্রিনিং: কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় জরায়ুমুখ ক্যান্সার স্ক্রিনিং জোরদার করা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
উপকূলের নারীরা প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে সত্য, কিন্তু নোনাজলের এই নীরব দহন তাদের ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে। তাদের বাঁচাতে হলে আজই আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে দক্ষিণের এই জনপদের দিকে।
এ জাতীয় আরো খবর..