ঈদে ঘুরে আসুন ঝিনাইদহ : ইতিহাস, প্রকৃতি আর বিনোদনের ঠিকানা

জোহান ড্রিম ভ্যালি পার্ক অ্যান্ড রিসোর্ট ঝিনাইদহের একটি জনপ্রিয় বিনোদন কেন্দ্র

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-১৮, | ১৩:৩২:৩৩ |

ঈদের ছুটিতে ব্যস্ততা আর কোলাহল পেছনে ফেলে পরিবার-পরিজন নিয়ে একটু স্বস্তির সময় কাটাতে চাইলে ঝিনাইদহ হতে পারে দারুণ একটি গন্তব্য। ইতিহাস, ঐতিহ্য আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই জেলার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে দর্শনীয় স্থান, যা ভ্রমণপিপাসুদের সহজেই আকর্ষণ করে। শহরের কাছাকাছি থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের নিরিবিলি পরিবেশ- সবখানেই মিলবে ভিন্ন স্বাদের অভিজ্ঞতা।

ঈদের এই অবকাশে ঝিনাইদহে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরে দেখার মতো বেশ কিছু সুন্দর ও ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঐতিহাসিক বারোবাজার এলাকার শাহী মসজিদ, প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী মল্লিকপুরের বটগাছ, ঢোল সমুদ্র দীঘি, জোহান ড্রিম ভ্যালি পার্ক, তামান্না ওয়ার্ল্ড ফ্যামিলি পার্ক, গাজী কালু-চম্পাবতী মাজার এবং নলডাঙ্গা মন্দির কমপ্লেক্স। এসব স্থানে ইতিহাসের ছোঁয়ার পাশাপাশি পাওয়া যাবে প্রকৃতির শান্ত স্নিগ্ধতা, যা ঈদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। ঐতিহাসিক বারোবাজার এলাকার শাহী মসজিদ

ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার প্রাচীন কীর্তি ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ স্থান বারোবাজার। কালীগঞ্জ উপজেলা শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দক্ষিণে বারোবাজার অবস্থিত। এর উপর দিয়ে চলে গেছে উত্তর-দক্ষিণে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক। জেলা শহর ঝিনাইদহের দূরত্ব ও অবস্থান বারোবাজার থেকে ২৬ কিলোমিটার উত্তরে। এর ১৭ কিলোমিটার দক্ষিণে বাংলাদেশের প্রাচীন জেলা শহর যশোর।

জোড়বাংলা মসজিদ

এই মসজিদের নামকরণ নিয়ে জনশ্রুতি আছে—মসজিদের পাশে একটি কুঁড়েঘরের জোড়া থাকার কারণে এমন নামকরণ। এক গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটি সুলতান গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলে নির্মিত হয়। পূর্বদিকে তিনটি খিলান এবং চারকোণায় কারুকাজযুক্ত চারটি মিনার রয়েছে।

গোড়ার মসজিদ

দৌলতপুরের বেলাট এলাকায় অবস্থিত এই মসজিদে চারটি গম্বুজ রয়েছে। মেহরাব ও দেয়ালে শিকল, বৃক্ষ, ফুল এবং পোড়ামাটির নান্দনিক নকশা রয়েছে। পাশেই রয়েছে একটি বড় দীঘি।

শুকুর মল্লিক মসজিদ

বর্গাকৃতির এই এক গম্বুজ মসজিদ দেখতে অনেকটাই ঢাকার বিনত বিবির মসজিদের মতো। মূল মেহরাবের দুপাশে দুটি বন্ধ মেহরাব রয়েছে, যেগুলিতে দৃষ্টিনন্দন পোড়ামাটির নকশা আঁকা।

গলাকাটা মসজিদ

বারোবাজারে অবস্থিত এই মসজিদটি সুলতানি আমলের অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন। গোলাকৃতির স্থাপনায় তিনটি দৃষ্টিনন্দন মেহরাব ও ছাদে কারুকাজ রয়েছে। মসজিদের পাশেই রয়েছে একটি বড় দীঘি।

নুনগোলা মসজিদ

এক গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদের তিনটি অর্ধবৃত্তাকার মেহরাবে জ্যামিতিক নকশা রয়েছে। বাইরের দেয়ালে রয়েছে খাড়া চাল ও খাঁজযুক্ত নিখুঁত ডিজাইন, যা একে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

কীভাবে যাবেন : রাজধানী ঢাকা কিংবা দেশের যেকোনো জেলা থেকে খুব সহজেই মসজিদের শহর বারোবাজারে পৌঁছানো যায়। ঝিনাইদহ থেকে গড়াই বা রূপসা বাসে চড়ে মাত্র ৩০-৪০ মিনিটের যাত্রায় পৌঁছে যাই বারোবাজারে। আর সবগুলো মসজিদ একই লাইনে ও কাছাকাছি থাকায় ভ্যান বা ইজিবাইক ১৫০-২০০ টাকায় ভাড়া করে ১ ঘণ্টার মধ্যে সবগুলো মসজিদ ঘুরে দেখা যাবে। সাধারণত ২৪ ঘণ্টাই এখানে প্রবেশ করা যায়। এখানে প্রবেশের জন্য কোনো প্রবেশ ফি নেই।

ঐতিহাসিক মল্লিকপুরের বটগাছ

ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বেথুলি গ্রামের মল্লিকপুরে বিস্তৃত একটি অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নাম মল্লিকপুর বটগাছ। প্রায় ১১ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই বিশালাকার বটগাছটি ৫২টি ভিন্ন আকারের বটগাছ নিয়ে তৈরি হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি একটি গাছেরই শাখা-প্রশাখা। গাছটির উচ্চতা প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ ফুট বলে ধারণা করা হয়। এই ঐতিহাসিক গাছটি ৩০০ বছরের পুরোনো বলে ধারণা করা হয়। গাছটির ছায়াঘেরা পরিবেশ, পাখির কলকাকলি এবং চারপাশের শান্ত সৌন্দর্য প্রতিটি দর্শনার্থীকেই মুগ্ধ করে । ঈদে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘোরাঘুরির জন্য  সুন্দর ও ঐতিহাসিক স্থান সুইতলা  মল্লিকপুরের বটগাছ ।  

কীভাবে যাবেন : ঝিনাইদহ শহর থেকে মল্লিকপুরের দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। শহর থেকে কালিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে সেখান থেকে অটোরিকশা বা সিএনজিতে করে সহজেই পৌঁছানো যায় সুইতলা মল্লিকপুর গ্রামের ঐতিহাসিক বটগাছ এলাকায়। ঝিনাইদহ শহর থেকে কালিগঞ্জ বাস ভাড়া জন প্রতি ৩০ টাকা । কালিগঞ্জ থেকে ২০ টাকা জন প্রতি  ভাড়া দিয়ে অটোরিকশা বা লাটা গাড়িতে খুব সহজে যেতে পারবেন এই খানে।

জোহান ড্রিম ভ্যালি পার্ক অ্যান্ড রিসোর্ট

ঝিনাইদহবাসীসহ আশপাশের জেলার ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য বিনোদনের অন্যতম আকর্ষণ এখন জোহান ড্রিম ভ্যালি পার্ক অ্যান্ড রিসোর্ট। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে ঈদের ছুটির দিনগুলো আরও আনন্দময় ও স্মরণীয় করে রাখতে আপনি আসতে পারেন জোহান ড্রিম ভ্যালি পার্ক এন্ড রিসোর্টে।

ঝিনাইদহ শহর থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে, ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা মহাসড়কের পাশে এবং ঝিনাইদহ পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সংলগ্ন মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠেছে এই বিনোদন কেন্দ্র।

এখানে, রাইড ও ওয়াটার পার্কের আকর্ষণ পার্কে রয়েছে মোট ১২টি আকর্ষণীয় রাইড, যেখানে রাইড ভেদে টিকিট মূল্য ৫০ থেকে ৮০ টাকা। এছাড়া প্রবেশসহ সকল রাইড উপভোগ করতে রয়েছে ৭০০ টাকার প্যাকেজ টিকিট। ওয়াটার পার্ক অংশটি খোলা থাকে প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। ওয়াটার পার্কে প্রবেশ মূল্য ৩০০ টাকা। ওয়াটার পার্ক ব্যবহারকারীদের জন্য লকার ফি ৫০ টাকা এবং সুইমিং ড্রেস ভাড়া ৫০ টাকা। সুইমিং ড্রেসের জন্য ১৫০ টাকা ফেরতযোগ্য জামানত রাখতে হয়।

প্রবেশ মূল্য ও অন্যান্য সুবিধা : ঝিনাইদহ সাধারণ প্রবেশ মূল্য ৭০ টাকা। ১ থেকে ৩ বছর বয়সী শিশুদের জন্য প্রবেশ উন্মুক্ত। পার্কটি সপ্তাহে ৭ দিন খোলা থাকে সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। এখানে রয়েছে ৭০০০ স্কয়ার ফিটের সুবিশাল কনভেনশন হল, ৩০টি প্রশস্ত পিকনিক স্পট এবং মনোরম পরিবেশে পিকনিক আয়োজনের সুব্যবস্থা। এছাড়া থাকার জন্য রুম সুবিধাও রয়েছে। বাস পার্কিংয়ের জন্য ৩০০ টাকা, ইজিবাইকের ৭০ টাকা, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কারের ৮০ টাকা এবং মোটরসাইকেলের জন্য ২০ টাকা। এই পার্কের ভেতরে বাইরের রান্না করা খাবার নিয়ে প্রবেশ করা যাবে না।

যেভাবে আসবেন : যেকোনো জেলা থেকে প্রথমে ঝিনাইদহ শহরে এসে সেখান থেকে চুয়াডাঙ্গাগামী বাসে সরাসরি পার্কের গেটে নামা যায় ১০ টাকা ভাড়ার বিনিময়ে। এছাড়া ইজিবাইকেও ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে  কিংবা নিজস্ব যানবাহনেও সহজেই পৌঁছানো সম্ভব।

ঢোল সমুদ্র দীঘি

প্রায় ৫২ বিঘা জমির উপর অবস্থিত ঝিনাইদহের ঢোল সমুদ্র দীঘি । যা ঝিনাইদহের সর্ববৃহৎ দীঘি। সুন্দর এবং মনোরোম পরিবেশ এই দীঘির মূল আকর্ষণ। বহুবছর আগে থেকেই এই দীঘি ঝিনাইদহে বিনোদনের একটি অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিভিন্ন উৎসবে যেমন পহেলা বৈশাখ, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, ঈদ ও বিভিন্ন পূজায় অনেক মানুষ ভিড় জমায় এই দীঘির পাড়ে। আবার অনেকেই দল বেঁধে এই দীঘির পাড়ে পিকনিক করতে আসে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা সময় কাটায় এই দীঘির পাড়ে। দীঘির চারিদিক ছোট ছোট টিলা রয়েছে। টিলার উপর থেকে উপভোগ করা যায় নজর কাড়া প্রাকৃতিক দৃশ্য। যেকোন প্রকৃতিপ্রেমীর হৃদয় মুহুর্তেই কেড়ে নেই অনাবিল সেই সৌন্দর্য।

কিভাবে যাবেন : ঝিনাইদ শহর থেকে  মাত্র ৪ কিমি পশ্চিমে পাগলাকানাই ইউনিয়নের  বেড়বাড়ি  গ্রামে । শহর  থেকে ২০/৩০ টাকার ইজিবাইক ভাড়ায়  এখানে  যাওয়া যায়। সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৬টার  মধ্যে এখানে যেতে পারবেন।

তামান্না ওয়ার্ল্ড ফ্যামিলি পার্ক

তামান্না ওয়ার্ল্ড ফ্যামিলি পার্ক ঝিনাইদহের একটি জনপ্রিয় ও মনোরম পারিবারিক বিনোদন কেন্দ্র। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশে সময় কাটানোর জন্য এটি একটি চমৎকার জায়গা। পার্কটিতে পরিবারের সকলের, বিশেষ করে শিশুদের বিনোদনের জন্য বিভিন্ন রাইড ও আকর্ষণীয় স্থান রয়েছে। ঝিনাইদহ পৌর শহর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে মুরারীদাহ গ্রামে এই পার্কটির অবস্থান। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত  এই পার্কটি খোলা থাকে এখানে জনপ্রতি ৫০ টাকা টিকিটের মূল্য। শহর থেকে ইজিবাইকে জনপ্রতি ১০ টাকা ভাড়ার বিনিময় যেতে পারেন ।

ঈদের আনন্দকে আরও রঙিন করতে ঝিনাইদহের এই ঐতিহাসিক ও বিনোদনকেন্দ্রগুলো হতে পারে আপনার সেরা গন্তব্য।


শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..