সকাল ৮টা। প্যারিসের ঐতিহাসিক সেন্ট-জার্মেই-দে-প্রে এলাকার ক্যাফেগুলোতে সবেমাত্র কফির সুবাস ছড়াতে শুরু করেছে। আইফেল টাওয়ারের শহরের ঘুম ভাঙার এই মুহূর্তে একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর শোনা যায়—‘সা ইয়ে!’ (এইতো!)। হাতে একগুচ্ছ ‘লা মঁদ’।
ফ্রান্সের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা নিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে চলছেন এক বৃদ্ধ। সাদা দাড়ি, চোখে-মুখে অমলিন হাসি আর পরনে চিরচেনা জ্যাকেট। তিনি আলী আকবর। ৭৩ বছর বয়সী এই মানুষটি কেবল একজন সংবাদপত্র বিক্রেতা নন, তিনি আধুনিক প্যারিসের এক চলন্ত কিংবদন্তি।
এই দীর্ঘ পথচলার স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি তিনি পেয়েছেন ফ্রান্সের অন্যতম সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা—ন্যাশনাল অর্ডার অব মেরিট।
আলী আকবরের জন্ম ১৯৫২ সালে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে। ১০ ভাই-বোনের বড় পরিবার। সংসারজুড়ে অভাব ছিল ছায়ার মতো।
মাত্র ১২ বছর বয়সে বই-খাতা তুলে রেখে নামতে হয়েছিল জীবনযুদ্ধে। স্বপ্ন ছিল বিদেশে গিয়ে মায়ের জন্য একটি পাকা বাড়ি বানাবেন। সেই স্বপ্নের পিছু ছুটে ১৮ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন আলী। আফগানিস্তান, ইরান, তুরস্ক আর গ্রিসের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ১৯৭৩ সালে যখন তিনি প্যারিসে পৌঁছেন, পকেটে তখন কানাকড়িও ছিল না। কোনো দিন জাহাজের মেঝে পরিষ্কার করেছেন, কোনো দিন রেস্তোরাঁয় ধুয়েছেন থালা-বাসন।
কখনো রাত কাটিয়েছেন খোলা আকাশের নিচে, ব্রিজের তলায়। তবে হাল ছাড়েননি। ওই বছরই এক বন্ধুর হাত ধরে শুরু করেন সংবাদপত্র বিক্রির কাজ।
প্যারিসের লাতিন কোয়ার্টারে পাঁচ দশক ধরে পত্রিকা বিক্রি করছেন আলী। তাঁর খরিদ্দারদের তালিকায় ছিলেন জাঁ পল সার্ত্রের মতো দার্শনিক থেকে শুরু করে বিখ্যাত সংগীতশিল্পী এলটন জন। তবে সবচেয়ে বড় চমকটি তুলে রেখেছিল নিয়তি। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে সায়েন্স পো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণ শিক্ষার্থী নিয়মিত আলীর কাছ থেকে পত্রিকা কিনতেন। সেই তরুণটি আর কেউ নন, বর্তমান ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ। ২৮ জানুয়ারি এলিসি প্রাসাদে যখন ম্যাখোঁ আলীর বুকে ‘নাইট’ (Chevalier) পদকটি গুঁজে দিচ্ছিলেন, তখন স্মৃতিচারণা করে বললেন, ‘আলী, আপনি আমাদের শহরের কণ্ঠস্বর। রাওয়ালপিন্ডিতে বড় হলেও আপনি ফরাসিদের মধ্যে একজন ফরাসি।’
ডিজিটাল যুগে যখন ছাপা পত্রিকা বিলুপ্তপ্রায়, তখনো আলী আকবর প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০টি পত্রিকা নিয়ে বের হন। তিনি কেবল খবর বিক্রি করেন না, বিক্রি করেন আনন্দ। পথচারীদের নজর কাড়তে তিনি মাঝেমধ্যে মজার সব শিরোনাম বানিয়ে চিৎকার করতেন। আজ প্যারিসের সেই পুরনো হকারদের মধ্যে একমাত্র তিনিই টিকে আছেন।
তথ্যসূত্র : বিবিসি, অ্যারাব নিউজ, মারফা পাবলিক রেডিও.কম
এ জাতীয় আরো খবর..