পানির কষ্টের সাথে তাদের আছে আরও যে কষ্ট

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-২৬, | ০২:০৬:১৪ |

উত্তর ভারতের খরাপ্রবণ বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলের প্রচণ্ড গ্রীষ্মে তাপমাত্রা যখন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস কিংবা তারও উর্ধ্বে উঠে যায়, তখন সাধারণ জীবনযাত্রা এমনিতেই দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। তবে এই চরম প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শতবর্ষ প্রাচীন সামাজিক বৈষম্য। উত্তর প্রদেশের জালউন জেলার একটি গ্রামের বাসিন্দা ৪০ বছর বয়সী মমতা যখন তীব্র গরমের মধ্যে দিনে প্রায় ১০ বার পানীয় জলের খোঁজে বের হন, তখন কেবল প্রখর রোদ বা দূরত্বের কষ্টই তার একমাত্র বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়ার কারণে তাকে মুখোমুখি হতে হয় গভীর সামাজিক নিপীড়নের।

গ্রামের নলকূপ থেকে জল সংগ্রহ করতে গিয়ে মমতাকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় উচ্চবর্ণের বাসিন্দাদের জল নেওয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, উচ্চবর্ণের প্রতিনিধিরা নলকূপে অবস্থান করার সময় দলিত পরিবারের সদস্যরা সেখান থেকে জল নিতে পারেন না। এমনকি তারা চলে যাওয়ার পর নলকূপটি 'পবিত্র' করার উদ্দেশ্যে ওপর থেকে অতিরিক্ত জল ঢেলে ধোয়া হয়, যা এই অঞ্চলে বহু দশক ধরে চলে আসছে। সরকারি সুপেয় জল প্রকল্পের অধীনে বসানো কলগুলো দুই বছর ধরে অকেজো হয়ে পড়ে থাকায় প্রায় এক হাজার বাসিন্দার এই গ্রামে হাতে গোনা কয়েকটি হ্যান্ডপাম্পই ভরসা। পরিবারের ১১ জন সদস্য ও গবাদিপশুর জল সংস্থানের এই অমানুসিক যুদ্ধে আতঙ্কের আবহ তৈরি হয়ে থাকে প্রতিটি পদে।

বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলটি ভৌগোলিক কারণেই ভূগর্ভস্থ জল ধারণে অক্ষম এবং খরাপ্রবণ। সে কারণে পানীয় জলের প্রতিটি উৎসের ওপর চরম চাপ তৈরি হয়। এলাকার প্রভাবশালী বর্ণ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা যেমন রাম গোপাল সিং অবশ্য জাতপাতভিত্তিক বৈষম্যের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, পুরোনো কুয়োগুলো শুকিয়ে যাওয়া এবং সংযোগ ব্যবস্থা বিকল হওয়ায় পাম্পগুলোর ওপর অতিরিক্ত ভিড় হচ্ছে, যার ফলে পানি নেওয়ার সময় বা পালা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয় মাত্র; এতে কোনো জাতপ্রথার সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসন এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রাজেশ কুমার পান্ডের দপ্তর থেকেও স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, ওই এলাকায় পানীয় জল নিয়ে কোনো ধরণের বৈষম্যের ঘটনা ঘটেনি এবং জল জীবন মিশনসহ নানা প্রকল্পের মাধ্যমে জল সংকট মেটানোর কাজ চলছে।

তবে স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালী সম্প্রদায়ের এই অস্বীকারের বিপরীতে স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরছেন ভুক্তভোগী ও মানবাধিকার কর্মীরা। শাহজাহানপুরের বাসিন্দা শিব জানান, তার পরিবারকে প্রবল গরমে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় কেবল উচ্চবর্ণের সদস্যরা সরে যাওয়ার আশায়। তিন বছর আগে একই ঘটনার জেরে শিবের মা পারমি দেবী হাতাহাতির শিকার হন এবং তাকে শারীরিকভাবে প্রহার করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। 

দলিত রাইটস অ্যান্ড জাস্টিস সেন্টারের প্রতিনিধি কুলদীপ সিং বাউধের মতে, তীব্র গরমের মাসগুলোতে পানি সংক্রান্ত বিরোধের খবর বহুগুণ বেড়ে যায়। পরিবেশ ও সামাজিক রাজনীতি বিষয়ক গবেষক মুকুল শর্মা উল্লেখ করেন যে, জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি এই অন্যায় সৃষ্টি না করলেও এটি বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও উসকে দিচ্ছে। ফলে শুধু পানির সরবরাহ বাড়ালেই এই জটিল সংকটের অবসান সম্ভব নয়, যতক্ষণ না জলের অধিকার থেকে সামাজিক বৈষম্যের কালো ছায়া সম্পূর্ণ দূর হয়।

বিবিসির প্রতিবেদন

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..