মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যে কি মার্কিন নির্ভরতা কমছে?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-০৮, | ২৩:৩০:১৭ |
সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিমুখী ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নতুন মোড় নিয়ে এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরান যুদ্ধের জেরে সৃষ্ট আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার স্থায়িত্ব নিয়ে ক্রমবর্ধমান সন্দেহের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। 

শুক্রবার (৭ আগস্ট) সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় এই প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ গড়ে তোলা। 

চুক্তি অনুযায়ী, এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে তিন দেশের ওপরই যৌথ আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং এর মাধ্যমে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করা হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের একক নির্ভরতায় পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউট অব পাবলিক পলিসির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক ফেলো ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিচসেন জানান, মার্কিন অংশীদারিত্বের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর মনে দীর্ঘ এক দশক ধরে সংশয় ছিল। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করা, পরবর্তীতে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি এবং তা সমাধানের অসফল প্রচেষ্টা এই শঙ্কাকে আরও তীব্র করে তুলেছে। তবে তিনি মনে করেন যে, ওয়াশিংটনকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার জন্য এই চুক্তি করা হয়নি, বরং মার্কিন সহায়তার পাশাপাশি অতিরিক্ত কৌশলগত ও নীতিগত বিকল্প তৈরি করাই এর লক্ষ্য।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির বিশ্লেষক সিনা তোসির মতে, এটি মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের ফলে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি পুনর্বিন্যাসের একটি বড় লক্ষণ। দীর্ঘকাল ধরে সৌদি আরব ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শক্তিশালী নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় থাকলেও রিয়াদ এখন ওয়াশিংটনের ওপর এককভাবে নির্ভর না করে আঞ্চলিক অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের পথ বেছে নিচ্ছে। 

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্প প্রশাসন আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর এর প্রভাব না ভেবেই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করায় মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্ররা মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছিল। এর জেরে ইরানি বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় এবং জ্বালানি ও বিশোধন প্লান্টের মতো বেসামরিক অবকাঠামোতেও আঘাত হানে। 

এছাড়া হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় আঞ্চলিক অর্থনীতিগুলো বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ভারী বিমান হামলার মুখেও ইরান প্রণালীতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং ওয়াশিংটনও তার মিত্রদের পর্যাপ্ত বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হিমশিম খেয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংকটের এই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের ওপর ঐতিহ্যগত নির্ভরতা চরম চাপের মুখে পড়েছে। তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক ইয়াসমিন ফারুক মনে করেন, এই চুক্তিকে মার্কিন ব্যবস্থার বিকল্প কোনো একক কাঠামো হিসেবে দেখা ভুল হবে। 

চুক্তিভুক্ত তিনটি দেশই মার্কিন অংশীদার এবং তারাও স্বীকার করে যে যুক্তরাষ্ট্রের সমতুল্য কোনো বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামো নেই। এছাড়া এই চুক্তি ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত বৃদ্ধির কোনো পদক্ষেপ নয়, বরং তিন দেশই যুদ্ধের শুরু থেকেই মধ্যস্থতা ও উত্তেজনা হ্রাসের ডাক দিয়ে আসছে। মূলত ইরানি আগ্রাসনের মুখে কৌশলগত সহযোগিতার মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদী ‘নর্মেটিভ ডিটারেন্স’ বা আদর্শগত প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই ঐতিহাসিক মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।

সূত্র: আল-জাজিরা।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..