✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-০৮, | ২০:৫৬:০৮ |যুক্তরাষ্ট্র কি তবে সত্যিই গোলাবারুদের সঙ্কটে ভুগছে? এই প্রশ্নটি এখন বিশ্ব রাজনীতির অলিন্দে এবং সামরিক বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলা দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার ফলে মার্কিন সামরিক ভাণ্ডার প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের কোনো কমতি নেই, কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলছে। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির কাছে প্যাট্রিয়ট মিসাইল ইন্টারসেপ্টর পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ট্রাম্প স্পষ্টতই বলেছেন যে এই অস্ত্রগুলো আমেরিকার নিজেদের সুরক্ষার জন্যই অত্যন্ত জরুরি।
পেন্টাগনের ভেতরের কিছু ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংকটটি কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়নি, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানগত বাস্তবতা। ইরানের সাথে চলমান এবং সম্ভাব্য সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনী তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি বিশাল অংশ ইতিমধ্যেই খরচ করে ফেলেছে। থাড এবং প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেমের মতো গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রগুলো এখন মারাত্মকভাবে ফুরিয়ে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সুনির্দিষ্ট ড্রোন এবং মিসাইল হামলার কারণে মার্কিন থাড ব্যবস্থার মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি এক্স-ব্যান্ড রাডার ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, যা মার্কিন সুরক্ষাবলয়কে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে।
একই অবস্থা দেখা যাচ্ছে প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের ক্ষেত্রেও। তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র বাহিনী তাদের পিএসি-২ এবং পিএসি-৩ ইন্টারসেপ্টর মজুদের বড় একটা অংশ ইতিমধ্যেই ব্যবহার করে ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে যাওয়ার আগে আমেরিকার কাছে যে পরিমাণ পিএসি-৩ ইন্টারসেপ্টর ছিল, তার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ড্রোন ও ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিহত করতে গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে যে কয়েকটি ইন্টারসেপ্টর হাতে রয়েছে, তা দিয়ে সক্রিয় ব্যাটারিগুলো সচল রাখা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরোনো প্রযুক্তির পিএসি-২ মিসাইলগুলো মজুদ থাকলেও আধুনিক এবং জটিল হুমকির মোকাবিলায় সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
অস্ত্র উৎপাদনের গতিও বর্তমান চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত ধীরগতির। প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের প্রধান উৎপাদক লকহিড মার্টিন এবং এর সহায়ক যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক বোয়িং সংস্থাগুলোর উৎপাদন লাইনে বিভিন্ন জটিল বাধার সৃষ্টি হয়েছে। একটি সম্পূর্ণ প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর প্রস্তুত করতে এবং এর কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। বর্তমান বৈশ্বিক চাহিদা এবং উৎপাদনের যে ব্যবধান, তাতে ব্যাকলগ বা জমে থাকা অর্ডারের পরিমাণ এতটাই বেশি যে পুরনো গতিতে উৎপাদন চালিয়ে গেলে এই ঘাটতি পূরণ করতে বহু বছর সময় লেগে যাবে।
শুধু আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্তাই নয়, স্থলযুদ্ধের অন্যতম প্রধান অস্ত্র এটিএসিএমএস মিসাইলের অবস্থাও প্রায় একই রকম। ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা প্রদান এবং মধ্যপ্রাচ্যে লাগাতার ব্যবহারের ফলে মার্কিন সেনাবাহিনীর এই দূরপাল্লার গাইডডেড মিসাইলের ভাণ্ডার প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। বিকল্প হিসেবে যে প্রিজম মিসাইল আসার কথা ছিল, তা এখনও উৎপাদনের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা তাইওয়ান ও কোরিয়ার মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে এই সুনির্দিষ্ট মিসাইল সরবরাহের পথ আপাতত এক প্রকার বন্ধ বললেই চলে।
স্থলবাহিনীর পদাতিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি ১৫৫ মিলিমিটার আর্টিলারি শেলের সাপ্লাই চেইনও চরম সংকটের মুখে পড়েছে। গত কয়েক বছরে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের ফ্রন্টলাইনে কোটি কোটি রাউন্ড শেল ব্যবহার করার কারণে পশ্চিমা বিশ্বের মজুদে বড় ধরনের ধস নেমেছে। মার্কিন সরকার টেক্সাসে নতুন অটোমেটেড উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চালালেও নানা প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতার কারণে তা এখনও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। ফলস্বরূপ, নতুন কোনো নির্ভরযোগ্য বিকল্প না পাওয়া পর্যন্ত আর্টিলারি শেলের এই ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সামগ্রিক অস্ত্র সংকট আগামী দশকে মার্কিন নিরাপত্তা নীতি এবং বৈশ্বিক কৌশলগত অবস্থানে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে বাধ্য। বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষরা এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভূ-রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব আরও বাড়াতে পারে, যার ফলস্বরূপ ইউক্রেনের পতন কিংবা তাইওয়ান ও কোরিয়া উপদ্বীপে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী বিমান চলাচল এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে এখনও শক্তিশালী হলেও, লজিস্টিকস এবং যুদ্ধাস্ত্রের এই দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি আমেরিকার বৈশ্বিক প্রভাবকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এখন তাদের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা কৌশল ঢেলে সাজাতে হবে এবং প্রতিরক্ষা শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করতে হবে। মিত্র দেশগুলোকেও তাদের নিজস্ব নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নেওয়ার সময় এসে গেছে, কারণ আমেরিকান নিরাপত্তা ছত্রছায়ার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতার দিন শেষ হয়ে আসছে। আগামী দশকটি স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তির পর থেকে বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সময় হতে চলেছে, যেখানে সামান্য ভুলের মাশুল গোটা বিশ্বকে পরিশোধ করতে হতে পারে।
এশিয়া টাইমসের বিশ্লেষণ