✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-০৮, | ১৯:২৯:১৯ |‘জস’ সিনেমার ঘাতক হাঙ্গর থেকে শুরু করে ‘শার্কনাডো’ সিনেমার টর্নেডো-তাড়িত শিকারী প্রাণী পর্যন্ত, চলচ্চিত্রগুলো দীর্ঘদিন ধরেই হাঙ্গরকে গ্রীষ্মের ভয়ের বস্তু হিসেবে চিত্রিত করে আসছে। কিন্তু যখন একটি হাঙ্গর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের জলরাশি ভেদ করে ছুটে যায়, তখন এটি এখন শুধু শিকার করার চেয়েও বেশি কিছু করতে পারে।
এটি এমন তথ্যও সংগ্রহ করতে পারে যা বিজ্ঞানীদের একটি হারিকেন উপকূলে আঘাত হানার আগেই তার সম্ভাব্য তীব্রতা বুঝতে সাহায্য করে। নিউইয়র্কের ডেলাওয়্যার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা পরীক্ষা করে দেখছেন, হাঙ্গরগুলো চলমান প্রায়-রিয়েল-টাইম সমুদ্র-তথ্য পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করতে পারে কি না। এই হাঙ্গরগুলো এমন সেন্সর বহন করে যা সমুদ্রের অবস্থা পরিমাপ করে সমুদ্রবিজ্ঞান, বায়ুমণ্ডল এবং জলবায়ু মডেলকে তথ্য সরবরাহ করে।
এই সিটিডি ট্যাগগুলো হলো ছোট ইলেকট্রনিক ডিভাইস যা সমুদ্রের বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা লবণাক্ততার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত একটি পরিমাপ এবং সেইসঙ্গে তাপমাত্রা ও গভীরতা পরিমাপ করে, যখন সামুদ্রিক প্রাণীগুলোর সঙ্গে এগুলো সংযুক্ত থাকে। তারা সাঁতার কাটে ও ডুব দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড পলিসির অধ্যাপক এবং প্রধান গবেষক অ্যারন কার্লাইল বলেছেন, প্রাণী-বাহিত সেন্সরগুলো সমুদ্রবিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে সফলভাবে ব্যবহার করে আসছেন, বিশেষ করে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ কম থাকায় মেরু অঞ্চলের হাতি সীলদের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়।
তিনি আরও বলেন, হাঙ্গর এই ধরনের গবেষণায় একটি নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। এই প্রাণীটির ব্যাপক বিস্তৃত এবং অনেক সুরক্ষিত সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় এদের নাগাল পাওয়া সহজ। এখন পর্যন্ত, হাঙ্গর ট্যাগিং সাধারণত কেবল এই মাছগুলো কোথায় ভ্রমণ করে এবং কোন বাসস্থান ব্যবহার করে, তা-ই ট্র্যাক করেছে।
ডেলাওয়্যার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এমন হাঙ্গর নির্বাচন করেন যা হারিকেন গবেষণার জন্য সবচেয়ে উপযোগী পরিমাপ সংগ্রহ করতে পারে। গবেষকরা এমন প্রজাতিকে অগ্রাধিকার দেন যা প্রায়শই জলের উপরে ভেসে ওঠে যাতে তাদের ট্যাগগুলো স্যাটেলাইটে তথ্য প্রেরণ করতে পারে।
পূর্ববর্তী বিশ্লেষণে উত্তর আটলান্টিকে এই ধরনের গবেষণার জন্য শর্টফিন মাকো হাঙ্গর, ব্লু শার্ক, স্মুথ হ্যামারহেড এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক গ্রেট হোয়াইট হাঙ্গরকে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কার্লাইল বলেন, আমরা আসলে সমুদ্রের ওপরের স্তরের তাপের পরিমাণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী, যা মিশ্র স্তর নামে পরিচিত।
কার্লাইল জানান, ট্যাগ লাগানোর প্রক্রিয়াটি অনেকটা গাড়ি দৌড় প্রতিযোগিতার ‘পিট ক্রু’-এর কাজের মতো দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয় এবং এতে সাধারণত পাঁচ মিনিটেরও কম সময় লাগে। হাঙরগুলোর ওপর বিরূপ প্রভাব কমানোর লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রাণী-যত্ন তদারকির আওতায় এই ট্যাগ লাগানোর কাজটি করা হয়।
ট্যাগগুলো এমন সব উপাদান দিয়ে লাগানো হয় যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ে গিয়ে খসে পড়ে। এছাড়া সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়ার আগে প্রতিটি হাঙরের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। কারণ মানসিক চাপে থাকা বা আঘাতপ্রাপ্ত হাঙর স্বাভাবিক আচরণ নাও করতে পারে, যা গবেষণার তথ্য বা ডেটাকে প্রভাবিত বা ত্রুটিপূর্ণ করে তুলতে পারে বলে কার্লাইল উল্লেখ করেন।
ওয়িয়ারনিকি জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে হাঙরকে যেভাবে ‘অতিরঞ্জিত ও নাটকীয়’ ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়, তার সঙ্গে বাস্তবতার পার্থক্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাস্তবতা কিন্তু সিনেমার মতো অতটা নাটকীয় নয়। ১৯৭৫ সালের ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘জস’-এ যেমনটা দেখা গিয়েছিল, সেখানে বিশাল এক ‘গ্রেট হোয়াইট শার্ক’ কাল্পনিক অ্যামিটি দ্বীপবাসীদের ত্রস্ত করে তুলেছিল।
ওয়িয়ারনিকি বলেন, ‘বিষয়টি অনেকটা হিসাবরক্ষণ বিভাগের কর্মী ববের মতো, দিনি কাজে যোগ দিয়ে দিনের তাপমাত্রার তথ্য বা প্রোফাইল জমা দিয়ে আবার বেরিয়ে পড়েন। এই প্রকল্পটি ‘শার্কনাডো’-এর মতো অতিরঞ্জিত ও কাল্পনিক চলচ্চিত্র সিরিজ থেকেও সম্পূর্ণ আলাদা।
ওয়িয়ারনিকি রসিকতা করে বলেন, আমরা এখনও হাঙরদের কোনো জলস্তম্ভের ভেতর দিয়ে এদিক-সেদিক পাঠাচ্ছি না। তবে তিনি বলেন, হাঙরদের নিয়ে কাজ করাটা বেশ ‘মজার’ হতে পারে। প্রকল্পটি সফল হলে হাঙরদের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে ধেয়ে আসা হারিকেন বা সামুদ্রিক ঝড়ের তীব্রতা সম্পর্কে পূর্বাভাস উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে।
ওয়িয়ারনিকি জানান, এই তথ্য নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ম্যাসাচুসেটস পর্যন্ত বিস্তৃত উপকূলীয় জনপদগুলোকে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য জোগাতে পারবে, যা ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকা ঝড়ের বিরুদ্ধে উপকূলের সুরক্ষা ও সহনশীলতা বাড়াতে সহায়ক হবে। কার্লাইল বলেন, অধিকাংশ মানুষেরই হয়তো মুক্ত পরিবেশে বা সমুদ্রে হাঙরের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হবে না, কিন্তু অনেকেই ভীতিকর সব ধারণা বা গৎবাঁধা নেতিবাচক ভাবমূর্তির মাধ্যমে এদের চেনে।
বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে এই গবেষক আরও বলেন, এরা চমৎকার প্রাণী যারা সমুদ্রের পরিবেশের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিয়েছে এবং এদের কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। আমরা যদি দেখাতে পারি, হাঙর মানুষের উপকারে আসতে পারে, তবে তা হবে সবার জন্যই লাভজনক একটি পরিস্থিতি।
সূত্র: রয়টার্স।