চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন মাইলফলক, জন্মের আগেই মায়ের গর্ভে শিশুর অস্ত্রোপচার!

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-০৩, | ১৯:২৬:২১ |

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকেরা। জন্মের আগেই মায়ের গর্ভে থাকা একটি শিশুর জটিল জন্মগত ত্রুটি সফলভাবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সংশোধন করা হয়েছে। 

চিকিৎসকদের এই যুগান্তকারী অস্ত্রোপচারের ফলে বর্তমানে পাঁচ মাস বয়সী শিশু থিও সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে।

থিওর মা ২৯ বছর বয়সী মেইজি স্যাভেজ, যিনি লন্ডনের বাসিন্দা। গর্ভাবস্থার ২৬তম সপ্তাহে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে অস্ত্রোপচার করান। শিশুটির জন্মগত রোগ ছিল গ্যাস্ট্রোস্কিসিস। এ অবস্থায় ভ্রূণের নাভি ঠিকভাবে গঠিত না হওয়ায় অন্ত্রসহ কিছু অভ্যন্তরীণ অঙ্গ শরীরের বাইরে চলে আসে।

চিকিৎসকেরা অত্যাধুনিক কিহোল বা ক্ষুদ্র ছিদ্রের অস্ত্রোপচার পদ্ধতি ব্যবহার করে মায়ের জরায়ুর একটি অংশ উন্মুক্ত করেন। এরপর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শিশুটির বাইরে থাকা অন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গ আবার পেটের ভেতরে স্থাপন করে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন।

বিশ্বে প্রথমবারের মতো পরিচালিত একটি বিশেষ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের আওতায় এ ধরনের অস্ত্রোপচারের সুবিধা পাওয়া তৃতীয় শিশু থিও।

বিরল সমস্যা
চিকিৎসকদের মতে, যুক্তরাজ্যে প্রতি বছর প্রায় তিন হাজার নবজাতকের মধ্যে একজন গ্যাস্ট্রোস্কিসিস নিয়ে জন্মায়।

সাধারণ ক্ষেত্রে এসব শিশুকে কয়েক সপ্তাহ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকতে হয়। তাদের টিউব বা শিরার মাধ্যমে পুষ্টি দিতে হয় এবং জন্মের পর অস্ত্রোপচার করতে হয়।

তবে জটিল গ্যাস্ট্রোস্কিসিসে আক্রান্ত শিশুদের অবস্থা আরও গুরুতর হতে পারে। তাদের ছয় মাস পর্যন্ত নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকতে হতে পারে, একাধিক অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে, এমনকি দুই বছর পর্যন্ত শিরার মাধ্যমে পুষ্টি দিতে হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে অন্ত্র প্রতিস্থাপনেরও প্রয়োজন পড়ে। উন্নত চিকিৎসা সত্ত্বেও প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজন শিশুর মৃত্যু হয়।

২০ সপ্তাহের পরীক্ষায় ধরা পড়ে সমস্যা
থিওর বাবা-মা, মেইজি স্যাভেজ ও জশ ফ্রেঞ্চ- দু’জনই শিক্ষক। তারা জানান, গর্ভাবস্থার ২০ সপ্তাহের নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষার আগে তারা কোনও সমস্যার আভাসই পাননি।

জশ বলেন, “আমরা শুধু আমাদের সন্তানের ছবি দেখার জন্যই উচ্ছ্বসিত ছিলাম। তখনও জানতাম না আমাদের ছেলে হবে।”

কিন্তু পরীক্ষায় চিকিৎসকেরা জানান, শিশুটির গ্যাস্ট্রোস্কিসিস হয়েছে। পরে আরও পরীক্ষা করে দেখা যায়, এটি সাধারণ নয়, বরং জটিল ধরনের গ্যাস্ট্রোস্কিসিস।

এরপর লন্ডনের গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা দম্পতিকে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস চিলড্রেনস হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

বেলজিয়াম থেকে টেক্সাস-দীর্ঘ চিকিৎসা যাত্রা
টেক্সাস চিলড্রেনস হাসপাতালের ভ্রূণ ও শিশু সার্জনদের একটি দল এই অস্ত্রোপচারের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করে। দলের নেতৃত্ব দেন প্রসূতি ও ভ্রূণ সার্জারি বিশেষজ্ঞ ড. মাইকেল বেলফোর্ট।

অস্ত্রোপচারের আগে মেইজিকে বেলজিয়ামের লুভেন হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞরা মায়ের জরায়ুর মাধ্যমে ভ্রূণের পেটের দেয়ালে বোটক্স ইনজেকশন প্রয়োগ করেন, যাতে পেশি শিথিল হয়ে অস্ত্রোপচার সহজ হয়।

এরপর পরিবারটি টেক্সাসে যায়। গত বছরের নভেম্বরে, গর্ভাবস্থার ২৬তম সপ্তাহে সেখানে অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন হয়।

যেভাবে করা হয় অস্ত্রোপচার
অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকেরা মায়ের জরায়ুর একটি অংশ বাইরে এনে ভ্রূণকে উপযুক্ত অবস্থানে স্থাপন করেন।

এরপর জরায়ুর ভেতরের অ্যামনিয়োটিক তরল বের করে তার জায়গায় কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস প্রবেশ করানো হয়, যাতে অস্ত্রোপচারের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি হয়।

পরে কিহোল সার্জারির মাধ্যমে শিশুটির বাইরে থাকা অন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গ ধীরে ধীরে পেটের ভেতরে প্রবেশ করানো হয় এবং ক্ষতস্থান সেলাই করে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

অস্ত্রোপচারের পর মেইজির শরীরে সিজারিয়ান অপারেশনের চেয়েও বড় একটি দাগ থেকে যায়। তবে অস্ত্রোপচারের পরও তাকে আরও ১৪ সপ্তাহ গর্ভে সন্তান বহন করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, “সেরে ওঠাটা খুব কঠিন ছিল। থিও প্রায়ই নড়াচড়া করত, ফলে ক্ষতস্থানে ব্যথা হতো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব কষ্টই সার্থক হয়েছে।”

সুস্থভাবেই জন্ম থিওর
অস্ত্রোপচার সম্পূর্ণ সফল হওয়ায় নির্ধারিত সময় পর্যন্ত গর্ভধারণ অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে টেক্সাসেই স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে থিওর জন্ম হয়।

বর্তমানে তার বয়স পাঁচ মাস এবং সে স্বাভাবিক শিশুদের মতোই বেড়ে উঠছে।

ড. মাইকেল বেলফোর্ট বলেন, “মা, শিশু, অস্ত্রোপচারের সময়, পুরো প্রক্রিয়া—সবকিছুই অসাধারণ ছিল। ভ্রূণের ওপর অস্ত্রোপচারের সময় বা পরে কোনও জটিলতা দেখা যায়নি।”

যুক্তরাজ্যেও চালু হতে পারে এই চিকিৎসা
গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক পাওলো ডে কপ্পি জানান, চলমান ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফল হলে খুব শিগগিরই যুক্তরাজ্যেও এই অস্ত্রোপচার শুরু করা হবে।

তার ভাষায়, “আমরা আশা করছি অদূর ভবিষ্যতে আরও অনেক রোগীকে এই চিকিৎসাসেবা দিতে পারব।”

ড. বেলফোর্টও আশাবাদী। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে মায়ের গর্ভেই হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের কিছু জটিল অস্ত্রোপচারও করা সম্ভব হতে পারে।

চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা
বর্তমানে লন্ডনে পরিবারের সঙ্গে রয়েছে থিও। মেইজি বলেন, “চিকিৎসকেরা যা করেছেন, তাতে ওর জীবনের শুরুটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এখন ও একেবারে স্বাভাবিক একটি শিশু।”

থিওর বাবা জশ বলেন, “আমরা নিজেদের খুবই ভাগ্যবান মনে করি। চিকিৎসকেরা শুধু আমাদের সন্তানের জীবনই বদলে দেননি, আমাদের পুরো পরিবারকে নতুন জীবন দিয়েছেন। এত কঠিন সময়ে তারা যেভাবে পাশে ছিলেন, তা আমরা কোনও দিন ভুলব না।” সূত্র: বিবিসি

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..