আমরা যখন ইরানের কথা বলি, তখন অধিকাংশ আলোচনাই ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন বা সামরিক শক্তিকে ঘিরে আবর্তিত হয়। অথচ একজন ব্যাংকার হিসেবে আমি মনে করি, ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত অন্য জায়গায়; তাদের আর্থিক উদ্ভাবন, বিকল্প বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনায়।
একটি প্রশ্ন নিজেকে করুন? যে দেশ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক সুইফট থেকে অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন, ডলারভিত্তিক লেনদেনে ব্যাপক সীমাবদ্ধ, সেই দেশ কীভাবে এখনও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রপ্তানিকারক?
উত্তরটি শুধু তেলক্ষেত্রে নয়; উত্তরটি অর্থনীতি, ব্যাংকিং, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং দক্ষ মানবসম্পদে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইরান প্রতিদিন প্রায় ৪.৮ মিলিয়ন ব্যারেল তরল জ্বালানি উৎপাদন করছে। এর মধ্যে প্রায় ২.৬ মিলিয়ন ব্যারেল বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। অর্থাৎ উৎপাদিত জ্বালানির প্রায় ৫৪ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছে, যদিও দেশটি কঠোর নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। এর বড় অংশই চীনের বাজারে যায়। একই সঙ্গে তারা এলপিজি, জ্বালানি তেল ও ন্যাপথাও ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রপ্তানি করে। ফলে ২০২৪ সালে তাদের তেল রপ্তানি আয় দাঁড়ায় প্রায় ৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
২০২৪ সালে ইরানের মোট বার্ষিক রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ১১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মোট আয়ের এই বিশাল অংশটি মূলত জ্বালানি তেল এবং অন্যান্য খনিজ বা রাসায়নিক শিল্প খাত থেকে অর্জিত হয়েছে। ইরানের অর্থনীতিতে তেল খাতের আধিপত্য বজায় থাকায় এই খাত থেকে ২০২৪ সালে আয় এসেছে প্রায় ৪৩ থেকে ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি ছিল দেশটির সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ, যা মোট আয়ের প্রায় ৪২ শতাংশের মতো।
তেল খাতের বাইরে অ-তেল বা অন্যান্য পণ্য রপ্তানি খাত থেকেও ইরান বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে, যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অ-তেল খাতের ভেতরে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে ছিল রাসায়নিক ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প খাত। এই খাতের অধীনে থাকা বিভিন্ন প্লাস্টিক সামগ্রী, মিথানল এবং ইথিলিন পলিমারের মতো পণ্য রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ আয় হয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ইথিলিন পলিমার রপ্তানি থেকেই এসেছে প্রায় ১.৮৮ বিলিয়ন ডলার।
ধাতু ও খনিজ আকরিক খাতের অবদানও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে আকরিক লোহা, ইস্পাত এবং নির্মাণ সামগ্রী রপ্তানি করে ভালো আয় ধরে রেখেছে। শুধু আকরিক লোহা খাত থেকেই দেশটির আয় হয়েছে প্রায় ১.১৩ বিলিয়ন ডলার।
কৃষি ও ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্য খাতের অবদানও ইরানের রপ্তানি অর্থনীতিতে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই খাতের মূল আকর্ষণ ছিল পেস্তা বাদাম, অন্যান্য শুকনো ফল এবং জাফরান। বিভিন্ন ধরনের বাদাম ও ফল রপ্তানি খাত থেকে ইরানের আয় প্রায় ৭৭৭ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শীর্ষ ফল হিসেবে ২০২৪ সালে শুধু খেজুর রপ্তানি খাত থেকেই ইরান প্রায় ২১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি আয় করতে সক্ষম হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীন, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং তুরস্কের মতো বড় আঞ্চলিক বাজারগুলোতে এসব পণ্য সরবরাহ করে ইরান তার সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে।
এই বাস্তবতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে; নিষেধাজ্ঞা অর্থনীতিকে দুর্বল করতে পারে, কিন্তু দক্ষ আর্থিক পরিকল্পনা থাকলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুরোপুরি থেমে যায় না।
ইরানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আর শুধুমাত্র মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরশীল নয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা ইউয়ানসহ অন্যান্য মুদ্রা, স্থানীয় মুদ্রায় নিষ্পত্তি, পণ্য-বিনিময় (বার্টার সিস্টেম) এবং বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাণিজ্য পরিচালনা করে। তাদের বাজেট নথিতে পণ্য-বিনিময় ব্যবস্থার গুরুত্বও উল্লেখ করা হয়েছে।
পশ্চিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ইরানের বিকল্প আর্থিক নেটওয়ার্ক প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলারের আমদানি-রপ্তানি নিষ্পত্তিতে ভূমিকা রাখে। এই নেটওয়ার্কে বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ হাউস, ট্রেড ফাইন্যান্স কাঠামো, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান এবং সীমান্তপারের আর্থিক সেবার সমন্বয় দেখা যায়।
প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও ইরান নতুন পথ খুঁজেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে ডিজিটাল মুদ্রার মতো ডিজিটাল অ্যাসেট এবং ব্লকচেইনভিত্তিক মূল্য স্থানান্তর ব্যবস্থাও সীমিতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো পুরো অর্থনীতির বিকল্প নয়, কিন্তু প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোর একটি উপাদান হিসেবে আলোচিত হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক "ডিজিটাল রিয়াল" নিয়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করেছে, যা ভবিষ্যতের ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো গঠনের একটি প্রচেষ্টা।
তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব সাফল্য কোনো একজন ব্যাংকারের কাজ নয়। এটি হাজারো ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, প্রকৌশলী, সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ, আইনবিদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং নীতিনির্ধারকদের বহু বছরের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং বিনিয়োগ সংকটের মতো গুরুতর সমস্যারও মুখোমুখি; এটিও সত্য।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
একটি দেশের কৌশলগত শক্তি শুধু যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্রে নয়; তা নির্ভর করে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে, ব্যাংকের ট্রেড ফাইন্যান্স ডেস্কে, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের কোডে, বিজ্ঞানীর গবেষণায়, অর্থনীতিবিদের নীতিতে এবং শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষে।
যদি আমরা বিশ্বমানের শিক্ষক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, ডাক্তার, ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তিবিদ তৈরি করতে পারি, তাহলে যেকোনো বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় আমাদের সক্ষমতাও বহুগুণে বাড়বে।
আমাদেরও উচিত গবেষণা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, আর্থিক উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করা। শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা, দক্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং উদ্ভাবনী অর্থনৈতিক চিন্তাই একটি দেশের কৌশলগত সক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি।
অস্ত্র একটি দেশকে যুদ্ধ জিততে সাহায্য করতে পারে; কিন্তু জ্ঞান, প্রযুক্তি, আর্থিক উদ্ভাবন এবং দক্ষ প্রতিষ্ঠানই একটি দেশকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখে। ইরানের অভিজ্ঞতা, তার সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা উভয়ই এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
এ জাতীয় আরো খবর..