সর্বশেষ :
কম খরচে নিখুঁত ও প্রাণঘাতী হামলা : ইরানের যে ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র কেন হঠাৎ দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়ছেন লাখ লাখ প্রবাসী সৌদি আরবে প্রায় ১৫ হাজার অভিবাসী গ্রেফতার ইয়েমেনে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বাড়ছে উদ্বেগ দাঁত মাজার পেস্টেই বিষ! প্রিমিয়ার লিগে ট্রান্সফার উন্মাদনা, শেষ মুহূর্তে বদলে যেতে পারে সব হিসাব বিশ্বকাপ মাতিয়ে ইনস্টাগ্রামে ফলোয়ার বৃদ্ধিতে সবার ওপরে হালান্ড ইংল্যান্ডকে টপকে র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ফিরল ভারত দোন্নারুমার বিয়েতে নরওয়ের সেই বিখ্যাত ‘ভাইকিং রো’ উদযাপনে হালান্ড আর্জেন্টিনায় ট্রায়াল শেষে দেশে ফিরে মারা গেলেন ফুটবলার

কম খরচে নিখুঁত ও প্রাণঘাতী হামলা : ইরানের যে ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-২৬, | ২২:৫৯:৩৮ |

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র খাইবার শেকান। তুলনামূলক কম খরচে তৈরি করা যায়, সহজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়া সম্ভব এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার নির্ভুলতার কারণে এটি তেহরানের অন্যতম কার্যকর অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রায় ৯০০ মাইল পাল্লার এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সাম্প্রতিক একাধিক জটিল হামলায় ব্যবহার করে ইরান।

মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে খাইবার শেকান নিক্ষেপ করছে ইরান। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভ্রান্ত করতে একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন গতিপথ, গতি ও আক্রমণ কৌশলের সমন্বয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছে।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, সংঘাত চলাকালে ছোড়া অধিকাংশ খাইবার শেকান যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেদ করে নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।

সামরিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ইরানের পুরোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি ভরতে হতো। কিন্তু খাইবার শেকান আগে থেকেই জ্বালানিপূর্ণ অবস্থায় সংরক্ষণ করা যায়। প্রয়োজন হলে দ্রুত ট্রাক বা মোবাইল লঞ্চারে তুলে উৎক্ষেপণ করা সম্ভব। মার্কিন বা ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের নজর এড়িয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি সচল রাখতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, খাইবার শেকানের কিছু সংস্করণে সামনের অংশে ছোট ইঞ্জিনসংবলিত ওয়ারহেড রয়েছে। উড্ডয়নের শেষ পর্যায়ে বিস্ফোরকবাহী এই অংশটি মূল ক্ষেপণাস্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং ঘণ্টায় প্রায় ৬ হাজার মাইল বেগে ছুটতে ছুটতে নিজস্ব গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে।

সাধারণভাবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মহাকাশ বা ঊর্ধ্বাকাশে উঠে সেখান থেকে তীব্র গতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে নেমে আসে। তবে অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথে গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা রাখে না। খাইবার শেকান নিয়ে গবেষণা করা বিশেষজ্ঞদের মতে, রাডারের নজর এড়ানো এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য এটি অন্যান্য অনেক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে।

মার্কিন কর্মকর্তারা আরও জানান, যুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে ইরান তাদের আক্রমণ কৌশলে পরিবর্তন আনছে। স্যাটেলাইটনির্দেশিত খাইবার শেকান দিয়ে যে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করা হচ্ছে, একই জায়গায় উচ্চগতির আক্রমণাত্মক ড্রোন এবং অপেক্ষাকৃত কম আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করছে তেহরান।

তাদের মতে, যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ রাডারগুলো বারবার ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এতে ওই অঞ্চলে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সাবেক প্রধান, অবসরপ্রাপ্ত আর্মি জেনারেল জোসেফ ভোটেল বলেন, ইরান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে এবং প্রতিপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য নতুন নতুন কৌশল তৈরি করছে।

তিনি বলেন, ইরানের ড্রোন সক্ষমতা অত্যন্ত উন্নত। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট কর্মসূচিতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকায় এই খাতে তাদের দক্ষতা উল্লেখযোগ্য।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের হাতে প্রায় দুই হাজার খাইবার শেকান ও অন্যান্য মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। স্বাধীন ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ফ্যাবিয়ান হিঞ্জের ধারণা, ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সংরক্ষিত যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে ইরান নতুন ক্ষেপণাস্ত্রও তৈরি করে থাকতে পারে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিন উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্রগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।

ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিকোল গ্রাজিউস্কির মতে, যুদ্ধ চলাকালেই ইরান উপলব্ধি করেছে যে খাইবার শেকান তাদের জন্য অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্র। কারণ এটি তুলনামূলক কম খরচে তৈরি করা যায়, বিভিন্ন ধরনের উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম থেকে নিক্ষেপ করা সম্ভব এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতাও বেশি।

ইসরায়েলের দিকেও খাইবার শেকান নিক্ষেপ করেছে ইরান। যদিও ইসরায়েলের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্রই তারা প্রতিহত করেছে। অন্যদিকে ইরানের দাবি, এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তারা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এবং বিমানবাহিনীর কমান্ডারের সদর দপ্তরেও হামলা চালিয়েছে। গত মাসে জেটচালিত ড্রোনের পাশাপাশি খাইবার শেকান ব্যবহার করে নতুন দফা হামলার ঘোষণাও দেয় তেহরান। তবে সেই হামলার ফলাফল স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

ঐতিহাসিক খাইবার যুদ্ধের স্মরণে এই ক্ষেপণাস্ত্রের নাম রাখা হয়েছে। ৬২৮ সালে আরবের খাইবার মরূদ্যান মুসলিম বাহিনীর দখলে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এ নামকরণ।

একটি খাইবার শেকান তৈরিতে ঠিক কত ব্যয় হয়, তা প্রকাশ করেনি ইরান। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যেসব ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে এগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা করে, সেগুলোর তুলনায় খাইবার শেকান অনেক কম ব্যয়বহুল। ব্যবহৃত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ধরনভেদে একটি মার্কিন বা ইসরায়েলি ইন্টারসেপ্টরের মূল্য ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

ফ্যাবিয়ান হিঞ্জের মতে, আগের হামলাগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে ইরান এখন ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে, যাতে শত্রুর প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সম্ভাবনা সর্বোচ্চ করা যায়।

তার ভাষায়, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণই নতুন তথ্য দেয়। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে কোন কৌশল সবচেয়ে কার্যকর, তা পর্যবেক্ষণ করে ইরান নিজেদের সক্ষমতা আরও উন্নত করছে। তিনি বলেন, তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে খাইবার শেকান উড্ডয়নের একেবারে শেষ মুহূর্তেও গতিপথ পরিবর্তন করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম।

সূত্র : দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..