সর্বশেষ :

চীনের বিরুদ্ধে ভারতের ‘হরমুজ কার্ড’ হতে যাচ্ছে গ্রেট নিকোবর?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-০৩, | ২৩:৩০:৪৮ |

গ্রেট নিকোবর দ্বীপকে ঘিরে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ভারত। মূলত ভারত মহাসাগরে কৌশলগত প্রভাব বিস্তার এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করতে দ্বীপটিকে একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সামরিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে মোদি সরকার। তবে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের (প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার) এই প্রকল্প ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন, পরিবেশবিদ ও আদিবাসী অধিকারকর্মীদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, মালাক্কা প্রণালীর প্রবেশমুখে অবস্থিত গ্রেট নিকোবর ভবিষ্যতে ভারতের জন্য এমন একটি কৌশলগত অবস্থানে পরিণত হতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যে হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের প্রভাবের সঙ্গে তুলনীয়।

কৌশলগত অবস্থানের কারণে গুরুত্ব
ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় এক হাজার ৬০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গ্রেট নিকোবর দ্বীপ ভৌগোলিকভাবে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উপকূলের অনেক কাছাকাছি। এটি মালাক্কা প্রণালীর পশ্চিম প্রবেশপথের নিকটে অবস্থিত, যেখানে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালিত হয়।

বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের একটি বড় অংশ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করে। বিশেষ করে চীনের জন্য মালাক্কা প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানি এবং দুই-তৃতীয়াংশ বৈদেশিক বাণিজ্য এই পথের ওপর নির্ভরশীল।

ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবেক ভাইস চিফ শেখর সিনহা বলেন, “গ্রেট নিকোবর মালাক্কা প্রণালীর মুখে অবস্থান করছে। এখান থেকে প্রণালীতে প্রবেশ ও বের হওয়া প্রায় সব ধরনের জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। এটি ভারতের সামুদ্রিক নজরদারি সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।”

মোদি সরকারের মেগা প্রকল্প
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার গ্রেট নিকোবরে একটি ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর, বেসামরিক ও সামরিক বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পর্যটন অবকাঠামো এবং প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের জন্য নতুন জনপদ নির্মাণের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে।

সরকারের দাবি, প্রকল্পটি শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, জাতীয় নিরাপত্তা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের কৌশলগত উপস্থিতি জোরদার করবে।

সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এই প্রকল্পের লক্ষ্য আন্দামান সাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের উপস্থিতি শক্তিশালী করা, জাতীয় নিরাপত্তা বাড়ানো এবং দ্বীপাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা।”

পরিবেশ ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কা
তবে প্রকল্পটি শুরু থেকেই প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়েছে। গ্রেট নিকোবর দ্বীপে বসবাসকারী শম্পেন ও নিকোবারি আদিবাসীরা তাদের ভূমি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং বিভিন্ন আদালতে মামলা দায়ের করেছেন।

দ্বীপটির মোট আয়তনের প্রায় ১৬ শতাংশ এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর প্রায় অর্ধেক অংশ আদিবাসী সংরক্ষিত এলাকার অন্তর্ভুক্ত, যেখানে শম্পেন জনগোষ্ঠীর বসবাস।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৩৯ জন আন্তর্জাতিক গণহত্যা-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়ে সতর্ক করেন যে, এই প্রকল্প শম্পেন জনগোষ্ঠীর জন্য ‘মৃত্যুদণ্ডের সমতুল্য’ হতে পারে এবং এটি আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যার পর্যায়ে পড়তে পারে।

ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৬৪ হাজার গাছ কাটা হবে। একই সঙ্গে দ্বীপে আগামী তিন দশকে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার নতুন বাসিন্দা বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে দ্বীপটির জনসংখ্যা ১০ হাজারেরও কম। ফলে জনসংখ্যা প্রায় ৪ হাজার শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে।

ভূমিকম্প ও সুনামির ঝুঁকি
গ্রেট নিকোবর ভারতের সবচেয়ে ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। এটি সিসমিক জোন-৫ এর অন্তর্ভুক্ত, যা সর্বোচ্চ ঝুঁকির শ্রেণি।

২০০৪ সালের ভয়াবহ ভারত মহাসাগরীয় সুনামির সময় দ্বীপটির দক্ষিণাংশ প্রায় ৪ দশমিক ২৫ মিটার নিচে দেবে যায়। ফলে ইন্দিরা পয়েন্ট এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। বর্তমানে সেখানে অবস্থিত বাতিঘরটির একটি অংশও সমুদ্রের পানিতে আংশিক নিমজ্জিত অবস্থায় রয়েছে।

পরিবেশবিদদের মতে, এত বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প এই ভঙ্গুর দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

বিরোধীদের তীব্র সমালোচনা
সম্প্রতি ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী গ্রেট নিকোবর সফর করে স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, “সরকার একে উন্নয়ন প্রকল্প বলছে। কিন্তু বাস্তবে মানুষের ঘরবাড়ি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। এটি উন্নয়নের ভাষায় সাজানো ধ্বংসযজ্ঞ।”

রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, প্রকল্পটি ভারতের প্রাকৃতিক ও আদিবাসী ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে ‘সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি ও গুরুতর অপরাধগুলোর একটি’।

চীনের বিরুদ্ধে কৌশলগত অস্ত্র?
মধ্যপ্রাচ্যে হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ভারতের কৌশলগত বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে কোনও সংঘাত হলে গ্রেট নিকোবর ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হতে পারে।

তবে সাবেক নৌ কর্মকর্তা শেখর সিনহা এ ধরনের ধারণাকে অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন।

তিনি বলেন, “হরমুজ প্রণালী ইরান ও ওমানের নিয়ন্ত্রণে। একইভাবে মালাক্কা প্রণালী মূলত ইন্দোনেশিয়ার জলসীমার মধ্যে। তাই ভারত চাইলে সহজে এটি অবরুদ্ধ করতে পারবে- এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।”

তবে তিনি স্বীকার করেন, গ্রেট নিকোবর উন্নয়ন করা হলে ভারত মালাক্কা অঞ্চলে আরও কার্যকর নজরদারি চালাতে পারবে এবং পুরো ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অধিকতর স্পষ্ট ধারণা পাবে।

উন্নয়ন নাকি দীর্ঘমেয়াদি দায়?
সমালোচকদের মতে, প্রকল্পটি মূলত একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ, যাকে এখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা বিশেষজ্ঞ মনীশ চান্দি বলেন, “এটি মূলত একটি বাণিজ্যিক প্রকল্প। এর সম্ভাব্য লাভ অনিশ্চিত, কিন্তু পরিবেশগত ক্ষতি হবে ব্যাপক। শেষ পর্যন্ত এটি ভারতের জন্য সম্পদ নয়, বরং দায়ে পরিণত হতে পারে।”

ফলে গ্রেট নিকোবর প্রকল্প এখন শুধু উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়; এটি ভারতের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সামরিক কৌশল, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আদিবাসী অধিকার- সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..