✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-০১, | ১৮:৫৮:৫৩ |যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২০টি সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ‘বিবিসি ভেরিফাই’-এর করা স্যাটেলাইট চিত্র ও ভিডিওর এক বিশেষ বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে, যা ওয়াশিংটনের জনসমক্ষে স্বীকার করা ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় অনেক বেশি।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিক থেকে শুরু করে গত তিন মাসে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশে ছড়িয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হেনেছে। এর ফলে আমেরিকার অত্যন্ত অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান এবং রাডার স্টেশনগুলোর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
পেন্টাগনের দাবি অনুযায়ী, ইরান ও লেবাননে তাদের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর পর থেকে তারা ইরানি ভূখণ্ডে ১৩ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। তবে তেহরানও বসে থাকেনি; যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি যৌথ হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ও যৌথ সামরিক ঘাঁটিগুলোকে নিশানা করেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি মার্কিন ঘাঁটিতে তাদের সামরিক সাফল্যের বিষয়টি তুলে ধরে গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য এখন আর মার্কিন ঘাঁটিগুলোর জন্য কোনো ‘নিরাপদ স্থান’ নয়। হোয়াইট হাউস বারবার দাবি করে আসছিল যে ইরানি সামরিক বাহিনীকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, স্যাটেলাইট চিত্রে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর যে ধ্বংসযজ্ঞ দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে তেহরানের পাল্টা হামলাগুলো মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবির চেয়ে অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট ও দূরপাল্লার ছিল। তবে ‘অপারেশনাল সিকিউরিটি’ বা সামরিক নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর।
বিবিসি ভেরিফাই জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতের স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ সীমিত করার জন্য প্রধান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘প্ল্যানেট’-কে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ছবির ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের অনুরোধ করেছিল। তা সত্ত্বেও অন্যান্য আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ছবি এবং প্ল্যানেটের পুরোনো ছবি মিলিয়ে এই ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উদঘাটন করা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ইরাক, বাহরাইন ও ওমানের ঘাঁটিগুলো এই হামলার শিকার হয়েছে এবং কিছু বিশ্লেষকের মতে এই সংখ্যা ২৮টি পর্যন্ত হতে পারে। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল রুওয়াইস ও আল সাদর এবং জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে থাকা প্রায় বিলিয়ন ডলার মূল্যের অত্যন্ত ব্যয়বহুল তিনটি থাড অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যাটারি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে আমেরিকার অত্যাধুনিক ই-৩ সেন্ট্রি নজরদারি বিমান এবং কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজানে স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা ও জ্বালানি বাংকার ধ্বংসের স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে।
পেন্টাগনের মে মাসের এক হিসাব অনুযায়ী, এই অভিযানে তাদের সামগ্রিক খরচ ইতোমধ্যে ২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার একটি বড় অংশ যাবে ধ্বংস হওয়া সরঞ্জাম মেরামত বা প্রতিস্থাপনে। এই যুদ্ধে আমেরিকার অন্তত ৪২টি যুদ্ধবিমান ও ড্রোন (যার মধ্যে এফ-১৫, এফ-৩৫ ফাইটার জেট এবং ২৪টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন রয়েছে) ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের শুরুতে ইরান ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখলেও, পরবর্তীতে তারা কৌশল বদলে সস্তা ড্রোনের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট ও উচ্চমূল্যের মার্কিন সামরিক সরঞ্জামগুলোকে নিখুঁত নিশানা করতে শুরু করে। মার্কিন থিংক ট্যাংক ‘স্টিমসন সেন্টার’-এর বিশ্লেষক ড. কেলি গ্রিকো সতর্ক করে বলেছেন, বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি যদি ভেঙে যায়, তবে মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থার যে পরিমাণ অবক্ষয় হয়েছে, তাতে পরবর্তী ইরানি হামলা মোকাবিলা করা ওয়াশিংটনের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।
সূত্র: বিবিসি