পাকিস্তানকে বিশ্বে কোণঠাসা করতে গিয়ে বিপাকে ভারত

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-২৯, | ১৯:০৬:৫৯ |

ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে ফেরা এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে নানামুখী নাটকীয় পরিবর্তনের ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দুই চিরবৈরী প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক সমীকরণ একবারে উল্টে গেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। গত এক দশকে বিশ্বমঞ্চে ইসলামাবাদকে পুরোপুরি একঘরে ও বিচ্ছিন্ন করার যে নীতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গ্রহণ করেছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত নয়াদিল্লির জন্যই বড় ধরণের ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান নিজেকে বৈশ্বিক কূটনীতির এক অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশগুলো তাদের কাছে টানতে মরিয়া। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের সাথে দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারিত্ব থাকা সত্ত্বেও ভারতের অবস্থান কিছুটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে যখন ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে এক সশস্ত্র হামলায় ১৮ জন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী মোদি কেরালায় এক জনসভায় দাঁড়িয়ে পাকিস্তানকে বিশ্বমঞ্চে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার হুংকার দিয়েছিলেন। কিন্তু এক দশক পর এসে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। পাকিস্তান এখন কেবল চীনের পরম মিত্রই নয় বরং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ওয়াশিংটনের অত্যন্ত বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইতিমধ্যে হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদ এক প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের কূটনৈতিক স্থবিরতা ও কৌশলগত ভুল সিদ্ধান্তের সুযোগ নিয়েই পাকিস্তান মার্কিন প্রশাসনের মন জয় করতে পেরেছে। বিশেষ করে ২০১৫ সালের মে মাসে কাশ্মীরের পহেলগামে পর্যটকদের ওপর হামলার জের ধরে ভারত যখন পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা চালায়, তখন পাকিস্তান পাল্টা আঘাত হেনে বেশ কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে বিশ্বকে চমকে দেয়। দীর্ঘ সামরিক উত্তেজনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় গভীর রাতে দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। পাকিস্তান তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাম্পের এই প্রশংসনীয় ভূমিকার স্বীকৃতি দিলেও নরেন্দ্র মোদী কৌশলগত কারণে নীরবতা বজায় রাখেন এবং ট্রাম্পের মধ্যস্থতার দাবি অস্বীকার করেন, যা পরবর্তীতে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে বড় ধরণের ফাটল ধরায়।

ভারত সবসময়ই কাশ্মীর ইস্যু বা পাকিস্তানের সাথে যেকোনো বিরোধকে সম্পূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে এবং এতে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন আত্মকেন্দ্রিক ও খামখেয়ালি নেতার কৃতিত্বকে অস্বীকার করা মোদী প্রশাসনের জন্য হিতে বিপরীত হয়েছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই একাধিকবার দাবি করেছেন যে তাঁর হস্তক্ষেপে এক ভয়াবহ পারমাণবিক যুদ্ধ থেকে রক্ষা পেয়েছে দক্ষিণ এশিয়া। এর পাশাপাশি তিনি পাকিস্তানি সেনাপ্রধানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, যা ভারতের নীতিনির্ধারকদের তীব্রভাবে মর্মাহত করেছে। ভারত যেখানে আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানকে একটি 'সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র' হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিল, সেখানে প্রমাণের অভাবে বিশ্ব দরবারে ভারতের সেই আখ্যান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পাকিস্তান প্রচারণামূলক যুদ্ধে জয়লাভ করে।

এই কূটনৈতিক ব্যর্থতার পাশাপাশি মোদী সরকারের অভ্যন্তরীণ কিছু নীতি ভারতের আঞ্চলিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করে তুলেছে। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর নরেন্দ্র মোদী ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির কথা বললেও ২০১৬ সালের পর থেকে পাকিস্তানের সাথে সব ধরণের আঞ্চলিক সহযোগিতা বয়কট করে সার্ক সম্মেলন স্থবির করে দেওয়া হয়। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অখণ্ডতা নষ্ট হয়েছে। এই সুযোগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকার সাথে ইসলামাবাদের সম্পর্কের নাটকীয় উন্নতি ঘটেছে এবং পাকিস্তানের চিরস্থায়ী বন্ধু চীনও তাদের অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে ইসলামাবাদের হাত শক্তিশালী করেছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, পাকিস্তানকে একঘরে করতে গিয়ে ভারত নিজেই তার প্রতিবেশীদের কাছ থেকে এক প্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

একই সাথে ভারতের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী 'কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন' বা নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি থেকে বিচ্যুতি ঘটার বিষয়টিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচিত হচ্ছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে ভারত ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইরানের কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। এছাড়া ফিলিস্তিন সংকটে ভারতের ঐতিহাসিক জোরালো অবস্থান থেকে সরে এসে মোদী সরকার ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান অস্ত্র ক্রেতা ও ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়েছে। গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের মুখেও ভারতের এই ইসরায়েল-ঘেঁষা নীতি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সাথে তাদের সম্পর্কে এক ধরণের শীতলতা তৈরি করেছে, যার বিপরীতে পাকিস্তান সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে নতুন করে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে লাভবান হচ্ছে।

অবশ্য ভারতের মোদী সরকারের অভ্যন্তরীণ উগ্র হিন্দুত্ববাদী নীতি এবং মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্যাতন ও অবমাননাকর মন্তব্যও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। পাকিস্তান এই সুযোগটি লুফে নিয়ে জাতিসংঘ এবং ওআইসির মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে ভারতের বিরুদ্ধে ইসলামভীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জোরালো প্রচারণা চালিয়েছে। তবে এতকিছুর পরও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি ভারত সফর করে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে যৌথ সহযোগিতার নতুন রূপরেখা ঘোষণা করেছেন, যা ইঙ্গিত দেয় যে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে সম্পর্ক কিছুটা শীতল হলেও ভারতের বিশাল বাজার ও অর্থনৈতিক শক্তির কারণে ওয়াশিংটন নয়াদিল্লিকে পুরোপুরি ছুড়ে ফেলবে না।

দক্ষিণ এশিয়ার এই ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে হলে ভারত ও পাকিস্তানকে শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলেই ফিরতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কাশ্মীরে দশকের পর দশক ধরে চলা সামরিক কঠোরতা ও মানবাধিকার সংকট নিরসনে একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক সমাধান অত্যন্ত জরুরি, যা কেবল দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব। সম্প্রতি ভারতের অভ্যন্তরেও সামরিক ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের সাথে পর্দার আড়ালের যোগাযোগ ও ব্যাক-চ্যানেল কূটনীতি পুনরায় চালু করার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য দুই দেশকেই অতি-জাতীয়তাবাদী বাগাড়ম্বর পরিহার করে পারস্পরিক উদ্বেগের বিষয়গুলো নিরসনে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..