স্যাটেলাইট থেকে ড্রোন- ইরানকে কতটা সামরিক সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-২০, | ১৪:০৬:৩২ |

রাশিয়া-ইরান সামরিক সহযোগিতা কতটা গভীর- এ প্রশ্নে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি মন্তব্য করেছিলেন, “মস্কো হয়তো কিছুটা সাহায্য করছে।”

তবে বাস্তবে এই সহযোগিতা গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, ড্রোন উন্নয়ন এবং সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ পর্যন্ত বিস্তৃত বলে বিভিন্ন বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা সূত্রের দাবি।

গত ১৩ মার্চ ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, রাশিয়া ‘কিছুটা’ সহায়তা দিতে পারে। 

এর একদিন পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মস্কোর সঙ্গে তেহরানের সামরিক সহযোগিতাকে ‘ভালো’ বলে উল্লেখ করেন। তার এই মন্তব্যের পর পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো নতুন করে গুরুত্ব পায়, যেখানে বলা হয়- রাশিয়া ইরানকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক বিমানের অবস্থানসংক্রান্ত স্যাটেলাইট ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ তথ্যের বড় অংশ আসতে পারে রাশিয়ার ‘লিয়ানা’ নামের সামরিক গোয়েন্দা স্যাটেলাইট ব্যবস্থা থেকে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাংক জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো পাভেল লুজিনের ভাষ্য, এই ব্যবস্থা মূলত মার্কিন নৌবহর ও বিমানবাহী রণতরীগুলো শনাক্ত ও নজরদারির জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

মহাকাশ সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ
ইরানের মহাকাশ কর্মসূচির উন্নয়নেও রাশিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২ সালে রাশিয়ার বাইকোনুর কসমোড্রোম থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় ইরানের ‘খাইয়াম’ স্যাটেলাইট। প্রায় ৬৫০ কেজি ওজনের এই উপগ্রহ পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার উচ্চতায় প্রদক্ষিণ করে এবং এক মিটার পর্যন্ত স্পষ্টতা নিয়ে ছবি ধারণ করতে সক্ষম।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, রাশিয়া চাইলে খাইয়াম স্যাটেলাইটের তথ্যও ব্যবহার ও বিশ্লেষণ করতে পারে এবং তা ইরানের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে পারে।

এরই মধ্যে ইরান দাবি করেছে, তারা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। যদিও পেন্টাগন এ দাবিকে ‘সম্পূর্ণ কল্পকাহিনি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। 

অন্যদিকে ইরানি গণমাধ্যম দাবি করেছে, ভারত মহাসাগরে একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারে হামলায় ‘বড় অগ্নিকাণ্ড’ ঘটেছে। তবে এ বিষয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনও মন্তব্য আসেনি।

দীর্ঘদিনের অস্ত্র সহযোগিতা
দশকের পর দশক ধরে রাশিয়া ইরানকে বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান, প্রশিক্ষণ বিমান, হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান এবং স্নাইপার রাইফেল। এসব চুক্তির আর্থিক মূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার পরও রাশিয়া ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য, সামরিক বিশেষজ্ঞ এবং অস্ত্রের যন্ত্রাংশ দিয়ে সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।

তবে মস্কো ও তেহরান নিজেদের কৌশলগত মিত্র হিসেবে তুলে ধরলেও তাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই। ফলে রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি।

ইউক্রেন যুদ্ধের পাল্টা সহযোগিতা
রাশিয়া যেমন ইরানকে সহায়তা করছে, তেমনি ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানও মস্কোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর ইরান রাশিয়াকে গোলাবারুদ, আর্টিলারি শেল, আগ্নেয়াস্ত্র, স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট সরবরাহ করেছে বলে পশ্চিমা সূত্রগুলোর দাবি।

সবচেয়ে আলোচিত সহযোগিতা এসেছে ‘শাহেদ’ কামিকাজে ড্রোন নিয়ে। তুলনামূলক ধীরগতির ও শব্দযুক্ত হলেও কম খরচে তৈরি করা যায় বলে রাশিয়া ইউক্রেনে ব্যাপকভাবে এ ড্রোন ব্যবহার করেছে। সময়ের সঙ্গে মস্কো এগুলোকে আরও উন্নত করে দ্রুতগামী ও অধিক প্রাণঘাতী বানিয়েছে। এতে ক্যামেরা, উন্নত নেভিগেশন ব্যবস্থা এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তিও যুক্ত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়ার এসব প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এখন আবার ইরানের কাছেও ফিরে যাচ্ছে।

‘কমেটা-বি’ প্রযুক্তি নিয়ে উদ্বেগ
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ লেবানন থেকে যে শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করেছিল, তাতে রাশিয়ার তৈরি ‘কমেটা-বি’ নেভিগেশন মডিউল পাওয়া গেছে। এই প্রযুক্তি ড্রোনকে জ্যামিং বা সংকেত বিঘ্ন মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলে।

এছাড়া রাশিয়া ইউক্রেনে বাস্তব ও ভুয়া ড্রোনের সমন্বয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভ্রান্ত করার যে কৌশল ব্যবহার করেছে, ইরানও এখন মধ্যপ্রাচ্যে সেই কৌশল প্রয়োগ করছে বলে পশ্চিমা কর্মকর্তাদের ধারণা।

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি মন্তব্য করেন, ইরানের সাম্প্রতিক হামলাগুলোর পেছনে ‘পুতিনের গোপন হাত’ থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সীমিত সহায়তা, সীমিত সক্ষমতা
তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, রাশিয়ার সহায়তা সত্ত্বেও ইরানের সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মার্চের শুরুতে কয়েকদিনে প্রতিদিন প্রায় ২৫০টি ড্রোন হামলার পর বর্তমানে ইরান দিনে প্রায় ৫০টির মতো ড্রোন ব্যবহার করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক বিশ্লেষক নিকিতা স্মাগিনের মতে, রাশিয়া তথ্য সরবরাহ করলেও তা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো নয়। তার ভাষায়, “তথ্য ইরানকে কিছুটা সাহায্য করছে, কিন্তু খুব বেশি নয়।”

যুদ্ধ থেকে লাভবান পুতিন?
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, রাশিয়া পুরোপুরি ইরানের বিজয় চায় না। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়, যা ইউক্রেন যুদ্ধে বিপুল ব্যয় বহনকারী রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য লাভজনক।

ইরান যদি হরমুজ প্রণালীতে চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং তেলের দাম দ্রুত বাড়ে। এতে রুশ তেলের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়।

ইউক্রেনের সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ইহর রোমানেঙ্কোর মতে, এই পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আর্থিকভাবে সহায়তা করছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাশিয়ার বর্তমান সহায়তা মূলত প্রতীকী- যার উদ্দেশ্য তেহরানকে দেখানো যে, মস্কো তাকে পুরোপুরি একা ফেলে দেয়নি।

নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিস সেন্টারের সহযোগী গবেষক রুসলান সুলেইমানভ বলেন, “ইরান বুঝতে পারছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক বিজয় সম্ভব নয়, এবং রাশিয়ার সহায়তাও সেই বাস্তবতা বদলাতে পারবে না।”

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের মন্তব্য- রাশিয়া ‘হয়তো কিছুটা সাহায্য করছে’। বিষয়টি অনকেটাই বাস্তব। সূত্র: আল-জাজিরা

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..