বিদেশী ধনীদের জন্য বিশেষ সুবিধার ‘গোল্ড কার্ড’ ভিসা চালু করেও প্রত্যাশা অনুযায়ী সাড়া পাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ১ মিলিয়ন বা ১০ লাখ ডলারের প্রোগ্রামটি বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করতে পারছে না। কর্মসূচিটি নিয়ে শুরু থেকেই আইনি জটিলতা ও অনিশ্চয়তা ছিল। এখন পর্যন্ত আবেদনকারীর সংখ্যাও খুব কম। সিএনবিসির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ‘গোল্ড কার্ড’ নামে নতুন ভিসা কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দেয় গত ডিসেম্বরে। এতে ১০ লাখ ডলার দিলে দ্রুত সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সুযোগ পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। ওই সময় সরকারি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছিল, ‘রেকর্ড সময়ে’ ভিসা পাবেন আবেদনকারীরা।
তবে সম্প্রতি আদালতে জমা দেয়া এক নথিতে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) জানায়, গোল্ড কার্ড আবেদনকারীরা অন্য সাধারণ ভিসা আবেদনকারীদের তুলনায় দ্রুত সুবিধা পাবেন না।
নথিতে বলা হয়, গোল্ড কার্ড আবেদনকারীদের আবেদন অন্য ভিসার চেয়ে দ্রুত নিষ্পত্তি হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে এ কর্মসূচি থেকে বড় অংকের আয় হওয়ার আশা করেছিল। সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক বলেছিলেন, ‘সরকার এ প্রকল্পের আওতায় ৮০ হাজার গোল্ড কার্ড ইস্যু করতে পারবে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রাজস্ব অর্জন হবে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। গত সপ্তাহে আদালতে দেয়া তথ্যানুযায়ী, এখন পর্যন্ত কেবল ৩৩৮ জন গোল্ড কার্ডের জন্য আবেদন করেছেন। এর মধ্যে ১৬৫ জন ১৫ হাজার ডলারের প্রসেসিং ফি জমা দিয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে কর্মসূচিটি নিয়ে আরো প্রশ্ন বেড়েছে।
গোল্ড কার্ডের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ বা সেলিং পয়েন্ট ছিল এর দ্রুত প্রসেসিং সময়। কর্মসূচিটির অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভিসার অনুমোদন পাওয়া যাবে।
গোল্ড কার্ড কর্মসূচির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা করেছে অ্যাফারমেটিভ লিটিগেশন ডেমোক্র্যাসি ডিফেন্ডার্স ফান্ড। সংগঠনটির আইনজীবী ক্রেইগ বেকার জানান, কর্মসূচির অবস্থান এখনো অস্পষ্ট।
তার ভাষ্য, বিদেশী ধনীদের আকৃষ্ট করতে হোয়াইট হাউজ দ্রুত ভিসা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু আদালতে সরকারের অবস্থান ভিন্ন। সেখানে বলা হচ্ছে, গোল্ড কার্ড আবেদনকারীরা বিশেষ সুবিধা পাবেন না। পুরো বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে উল্লেখ করেন ক্রেইগ বেকার।
তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ ও ডিএইচএস কোনো মন্তব্য করেনি।
অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, কর্মসূচিটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। কংগ্রেস অনুমোদন দিলে এবং কিছু আবেদন সফলভাবে সম্পন্ন হলে ভবিষ্যতে এটি জনপ্রিয় হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বিশ্বে ধনী ব্যক্তিদের দেশান্তরের প্রবণতা আগের চেয়ে বেড়েছে। হেনলি অ্যান্ড পার্টনারসের তথ্যমতে, ২০২৬ সালে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার মিলিয়নেয়ার অন্য দেশে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, ধনীদের ওপর কর বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে অনেকে বিকল্প নাগরিকত্ব বা আবাসনের সুযোগ খুঁজছেন।
এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখনো ধনীদের আকর্ষণীয় গন্তব্য। দেশটিতে আগে থেকেই ইবি-৫ নামে বিনিয়োগভিত্তিক ভিসা কর্মসূচি রয়েছে। তবে সেখানে দীর্ঘ অপেক্ষা ও জটিলতাও রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ সুযোগ কাজে লাগাতে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন গোল্ড কার্ড চালু করে। এতে সরকারের কাছে ফেরতযোগ্য নয়, এমন ১০ লাখ ডলার জমা দিলেই আবাসনের সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইন নির্ধারণের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। এজন্য ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বিদ্যমান ইবি-১ ও ইবি-২ ভিসা ক্যাটাগরি ব্যবহার করে গোল্ড কার্ড চালু করেন।
ইবি-১ ও ইবি-২ সাধারণত বিশেষ যোগ্যতা বা জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত। গোল্ড কার্ড কর্মসূচিতে ১০ লাখ ডলার দিলেই আবেদনকারীকে বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মামলাকারীরা বলছেন, এতে প্রকৃত যোগ্য আবেদনকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। কারণ কংগ্রেস প্রতি বছর ইবি-১ ও ইবি-২ ভিসার সংখ্যা নির্ধারণ করে দেয়। গোল্ড কার্ড আবেদন বাড়লে অন্য আবেদনকারীদের সুযোগ কমে যেতে পারে।
তবে ডিএইচএস আদালতে জানায়, গোল্ড কার্ড কর্মসূচি ইবি-১ ও ইবি-২ আবেদনকারীদের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। কারণ পর্যাপ্ত ভিসা রয়েছে ও গোল্ড কার্ডের জন্য আলাদা কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে।
নিউইয়র্কভিত্তিক অভিবাসন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডাসেইন অ্যাডভাইজার্সের প্রধান নির্বাহী রিয়াজ জাফরি জানান, দ্রুত অনুমোদনের নিশ্চয়তা থাকলে এটি বড় পরিবর্তন আনতে পারত।
অন্যদিকে গোল্ড কার্ড নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়লেও পুরনো ইবি-৫ কর্মসূচিতে আগ্রহ বাড়ছে। এ কর্মসূচিতে ৮-১০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে অন্তত ১০টি পূর্ণকালীন চাকরি তৈরি করতে হয়। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সুযোগ পাওয়া যায়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ডেভিড লেসপারেন্স জানান, আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীরা এমনিতেই বিভিন্ন ভিসার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তার মতে, যারা করদাতা হতে রাজি, তারা ইবি-৫ কর্মসূচির মাধ্যমেই গ্রিন কার্ড পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
এ জাতীয় আরো খবর..