জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনো

সমুদ্রের তাপমাত্রা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-১২, | ১৯:০৭:২৯ |
সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ‘এল নিনো’ চক্র যুক্ত হয়ে আসন্ন মাসগুলোয় বড় ধরনের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

পরিবেশবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এল নিনো একত্রে কাজ করলে এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও পড়বে। কৃষি, খাদ্য সরবরাহ, জ্বালানি, সাপ্লাই চেইনসহ পরিবহন ও শ্রমবাজারে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য বলছে, চলতি বছরের এপ্রিলে বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ সময় মেরু অঞ্চল ছাড়া বিশ্বের সমুদ্রগুলোর গড় তাপমাত্রা ছিল ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। এর আগে ২০২৪ সালের এপ্রিলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। ওই সময়ও বিশ্বে এল নিনোর প্রভাব ছিল।

বিজ্ঞানীদের মতে, এভাবে তাপমাত্রা বাড়া একটি শক্তিশালী ‘এল নিনো’ পর্যায় শুরু হওয়ার লক্ষণ। এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণতা। এটি একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়া চক্র। সাধারণত দুই-সাত বছর পর পর এটি দেখা দেয়। এল নিনো তৈরি হলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা সাময়িকভাবে আরো বেড়ে যায়। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যায়। কোথাও অতিবৃষ্টি হয়, কোথাও দীর্ঘ খরা দেখা দেয়। দাবানল, ঘূর্ণিঝড় ও তাপপ্রবাহের ঝুঁকিও বাড়ে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মতে, চলতি বছরের শেষের দিকে এল নিনো ফিরে আসার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশের বেশি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া দপ্তর এ সম্ভাবনা ৬১ শতাংশ বলে জানিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া ব্যুরোও বলেছে, বিভিন্ন জলবায়ু মডেল সমুদ্রের তাপমাত্রা আরো বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বছরের শেষ দিকে তা এল নিনোর মাত্রায় পৌঁছতে পারে। তবে কখন এটি পুরোপুরি তৈরি হবে ও কতটা শক্তিশালী হবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।

অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনোর দ্বিমুখী আক্রমণ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্বের অনেক দেশকে এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খাদ্যদ্রব্যের দাম ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপ সামালাতে হচ্ছে। এর মধ্যে চরম আবহাওয়া বাড়লে কৃষি উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে খাদ্যের দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার কৃষিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, এল নিনোর প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যায়। বিশ্বের অনেক জায়গায় খরা দেখা দেয়ায় ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। যেমন দক্ষিণ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশে গত এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করেছে। কৃষি উৎপাদন কমলে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।

এছাড়া চরম আবহাওয়া যেমন বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়লে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়। উত্তর আমেরিকা, কানাডা ও দক্ষিণ চীনে গত এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত এবং আর্দ্রতা লক্ষ করা গেছে। পাশাপাশি অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, যা জাতীয় বাজেটে বড় ধরনের চাপ তৈরি করে।

সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়লে সামুদ্রিক প্রাণীর ওপরও মারাত্মক প্রভাব পড়ে। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে এরই মধ্যে বড় ধরনের ‘মেরিন হিটওয়েভ’ বা সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ তৈরি হয়েছে। ফলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মৎস্যসম্পদের ক্ষতি সমুদ্রনির্ভর অর্থনীতিগুলোর জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ।

তাপমাত্রার রেকর্ড ও বৈচিত্র্য
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সাল ছিল ইতিহাসের উষ্ণতম বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম। গত এপ্রিল মাসটি ছিল ১৯৯১-২০২০ সালের গড় তাপমাত্রার তুলনায় দশমিক ৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ। তবে এ তাপমাত্রার প্রভাব সব অঞ্চলে একভাবে পড়েনি। যেমন ইউরোপের স্পেনে গত এপ্রিল ছিল ইতিহাসের উষ্ণতম, আবার পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোয় ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঠাণ্ডা। একইভাবে বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রেও বিশাল বৈষম্য দেখা গেছে এপ্রিলে। একদিকে আফগানিস্তান, আরব উপদ্বীপ ও জাপানে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে। অন্যদিকে মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশ ছিল বেশ শুষ্ক। আর্কটিক অঞ্চলের সমুদ্রের বরফও রেকর্ড পরিমাণ কমেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকৃতির এ অস্বাভাবিক আচরণ মোকাবেলা করতে হলে এখনই বিশ্বব্যাপী কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। অন্যথায় ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতিকে জলবায়ু পরিবর্তনের এক চড়া মূল্য দিতে হতে পারে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..