আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা

যুদ্ধের অর্থনৈতিক আঘাত সবচেয়ে বেশি ভোগাবে দরিদ্র দেশগুলোকে

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-২০, | ১৩:৪০:৫১ |
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত রেখে যাচ্ছে।

এর মাশুল সবচেয়ে বেশি দিতে হবে স্বল্প আয়ের দেশগুলোকে। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠক শেষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ আশঙ্কার কথা বলেন। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উন্নত দেশগুলো অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে আশাবাদী, কিন্তু উন্নয়নশীল ও স্বল্প আয়ের দেশগুলো এরই মধ্যে এক ভয়াবহ ত্রিমুখী সংকটে পড়েছে।

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বৈঠকে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তারা আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন। ইউরোপের একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এ যুদ্ধকে ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

তুরস্কের অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ফাতিহ বিরলের মতে, যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের প্রভাব বিশ্বের সব দেশ সমানভাবে অনুভব করবে না। এ অর্থনৈতিক মন্দার ধাক্কা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হবে উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোয়। বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‌আন্তর্জাতিক মহলে যাদের কণ্ঠস্বর তেমন একটা শোনা যায় না, তারাই এ সংকটের প্রধান শিকারে পরিণত হবে।’

আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, ‘‌যুদ্ধ যদি আগামীকালও শেষ হয়ে যায়, তবু এটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক গভীর হুমকি হয়ে থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, গত প্রায় দেড় মাসে সৃষ্ট শুধু জ্বালানি সংকটই কাটতে সময় কয়েক মাস।’

ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার মতে, পরিস্থিতি গুরুতর হলে অনেক দেশকে অতিরিক্ত আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে, যার মধ্যে আফ্রিকার পাঁচ-আটটি দেশ রয়েছে।

এর আগে আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ) সতর্ক করে জানায়, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি সচল হলেও জ্বালানি সরবরাহ ও এর বাজারমূল্য স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে আরো কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে। অপরিশোধিত তেলের প্রবাহ শুরু হলেও শোধনাগারগুলোর কারিগরি সমস্যার কারণে জ্বালানি সংকটের রেশ দীর্ঘস্থায়ী হবে।

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যসহ উত্তর আফ্রিকা, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান অঞ্চলের অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পিটারসন ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট অ্যাডাম পোজেন জানান, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো এখন তিনটি দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এগুলো হলো জ্বালানি, খাদ্য ও সারের উচ্চমূল্য; এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শক্তিশালী ডলার। ফলে এসব দেশে উৎপাদন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে তেলের দাম চড়া থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে ইথিওপিয়া থেকে সিয়েরা লিওন পর্যন্ত জ্বালানি সংকট ছড়িয়ে পড়েছে। এ সংকট সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন খাতকে স্থবির করে দিচ্ছে। কেবল দেশগুলোর মধ্যেই নয়, বরং একটি দেশের অভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বৈষম্য বাড়তে দেখা যাচ্ছে। একে বলা হচ্ছে ‘কে-শেপ’ অর্থনীতি।

যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিপ্লব ও জ্বালানি রফতানিকারক দেশ হওয়ায় দেশটির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকতে পারে। কিন্তু দেশটির সাধারণ ও সল্প আয়ের মানুষ পাম্পে গিয়ে জ্বালানি তেলের চড়া দাম দিতে হিমশিম খাচ্ছে, অন্যদিকে ধনীরা শেয়ারবাজারের ঊর্ধ্বগতি ও কর ফেরতের সুবিধা ভোগ করছে।

এমন সংকটময় মুহূর্তে আইএমএফ পরামর্শ, বিভিন্ন দেশের সরকারকে সুনির্দিষ্ট ও সাময়িক ভর্তুকি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু পাকিস্তানের সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর রেজা বাকির মনে করেন, রাজনৈতিক বাস্তবতায় খাদ্য ও জ্বালানির ওপর থেকে ভর্তুকি কমানো সরকারগুলোর জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে। দাম বাড়লে সরকারগুলো জনগণের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠার ভয়ে পড়বে। অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর অর্থমন্ত্রী ডুডু রাসেল বলেন, ‘‌যেসব দেশ গত কয়েক বছরে শক্ত অর্থনৈতিক সংস্কার করেছে, তারা এ ঝড় সামলে উঠতে পারবে।’

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) মতে, ইরানের সংঘাত শুরু হওয়ার আগে বিশ্ব অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়েও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পথে ছিল। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এ সম্ভাবনা কার্যত মিলিয়ে গেছে। নতুন প্রাক্কলন অনুযায়ী, গত বছরের ৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থেকে কমে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ২ দশমিক ৯ শতাংশে। ২০২৭ সালে এটি সামান্য বেড়ে ৩ শতাংশ হতে পারে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..