টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায় নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট দল। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে তাদের মূল পরিকল্পনা দ্রুত ভেঙে পড়তেই পুরো দল যেন ছন্দ হারিয়ে ফেলে। সাধারণত ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত কৌশল বদলাতে পারা দল হিসেবে পরিচিত হলেও আহমেদাবাদের এই ম্যাচে তা করতে পারেনি কিউইরা।
টস হেরেও ফাইনালে আগে ব্যাট করে ভারতীয় দল তোলে ৫ উইকেটে ২৫৫ রান, যা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালের ইতিহাসে সর্বোচ্চ স্কোর। ম্যাচের শুরুতেই ভারতের ব্যাটারদের নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনা করেছিল নিউজিল্যান্ড, কিন্তু তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয় তারা।
টসেই বড় ভুলটা করে ফেলেছিল নিউজিল্যান্ড। যে দলটিতে মারকুটে ব্যাটারের অভাব নেই, আর যে উইকেট নিয়ে খুব বেশি কথা হচ্ছিল যে, ভারতীয় ব্যাটারদের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে, সেই উইকেটে টস জিতে কেউ ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেবে, তা হয়তো অসম্ভবই ছিল। বিশেষ করে ফিন অ্যালেনদের মত ব্যাটার থাকতে ভারতীয়দের সামনে বড় স্কোরের চাপ তৈরি করার সুযোগ হাতছাড়া করার কথাই না। কিন্তু নিউজিল্যান্ড সে কাজটাই করলো। ব্যাটিং স্বর্গে ভারতকেই ব্যাটিংয়ের সুযোগ করে দিলো। এরপর যা করার তা সাঞ্জু স্যামসনরা করে নরো।
প্রথম পাঁচ ওভারেই নিউজিল্যান্ডের বোলাররা আটটি ওয়াইড দেন। এত দ্রুত ও এত বেশি অতিরিক্ত রান দেওয়ার ঘটনা তাদের ক্ষেত্রে খুবই বিরল। ফলে ভারতের ইনিংসের শুরুতেই চাপ তৈরি করার পরিবর্তে উল্টো নিজেদের ওপরই চাপ বাড়িয়ে ফেলে কিউইরা।
নিউজিল্যান্ডের পরিকল্পনা ছিল ভারতের ব্যাটারদের নাগালের বাইরে বল রাখা; কিন্তু বারবার ওয়াইড বল করায় সেই পরিকল্পনাই ব্যর্থ হয়ে যায়। এক সময় মনে হচ্ছিল তারা যেন ক্রিকেট নয়, লুকোচুরি খেলছে।
ম্যাচে বোলিং রোটেশনেও ছিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আগের দ্বিপাক্ষিক সিরিজে ভারতের কাছে হারার পর থেকে তারা এক ওভারের স্পেলে বোলার ব্যবহার করার কৌশল নিয়েছিল। তবে সেই পরিকল্পনার মধ্যেই কম বোলিং করানো হয় এমন এক বোলারকে, যিনি ভারতের ইনিংসে সীমারেখাহীন কয়েকটি ওভারের একটি করেছিলেন।
গ্রেন ফিলিপস পাওয়ারপ্লেতে খুব কমই বোলিং করেন; কিন্তু এই ম্যাচে তিনি ওপেনারদের কিছুটা চাপে রাখেন। তবুও ভারতের ব্যাটাররা সুযোগ পেলেই বড় শট খেলতে থাকে।
নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক মিচেল সান্তনার ম্যাচ শেষে স্বীকার করেন, ভারতের ব্যাটারদের থামানোর মতো নিখুঁত পরিকল্পনা তাদের ছিল না।
তার ভাষায়, ‘আমরা জানতাম সাঞ্জু, অভিষেক এবং ইশান কিশান চারদিকে শট খেলতে পারে। যখন তারা ছন্দে থাকে, তখন তাদের থামানো খুব কঠিন। আমরা ইয়র্কার, বাউন্সার, স্লোয়ার- সবকিছু চেষ্টা করেছি; কিন্তু পিচ থেকে খুব একটা সহায়তা না পাওয়ায় বলগুলো সহজেই বাউন্ডারিতে চলে যাচ্ছিল।’
আহমেদাবাদের গ্যালারিতে প্রায় ৮৬ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন। ম্যাচের আগে জমকালো সমাপনী অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেছিলেন পপ তারকা রিকি মার্টিন; কিন্তু প্রকৃত উত্তেজনা তৈরি হয় ভারতের ব্যাটিংয়ে।
ভারতীয় ব্যাটাররা ইনিংসে মোট ৩৭টি বাউন্ডারি হাঁকান। প্রতিটি চার-ছক্কায় গ্যালারিতে তৈরি হচ্ছিল তুমুল উচ্ছ্বাস। সাঞ্জু স্যামসনের শক্তিশালী শট, অভিষেক শর্মার আগ্রাসী ব্যাটিং এবং শেষদিকে শিভাম দুবের ঝড়ো ইনিংস ম্যাচটিকে পুরোপুরি ভারতের দখলে নিয়ে যায়।
নিউজিল্যান্ডের পেসার লকি ফার্গুসন বিশেষভাবে ভুগেছেন। মাত্র দুই ওভারে ৪৮ রান দিয়ে পরে আর বোলিংয়েই ফেরেননি। টুর্নামেন্টে তার ধীরগতির বল বেশ কার্যকর ছিল, কিন্তু এই ম্যাচে তা একদমই কাজ করেনি।
ফাইনালে হারের এই অভিজ্ঞতা নিউজিল্যান্ডের জন্য নতুন নয়। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হার, ২০১৯ সালে নাটকীয় পরাজয়- এসব স্মৃতি এখনও তাজা। যদিও সেই আসরে সেমিফাইনালে ভারতকে হারিয়ে তারা আলোচনায় এসেছিল।
এই ম্যাচেও কয়েকটি মুহূর্তে উত্তেজনা তৈরি হয়। একসময় ড্যারিল মিচেল কিছুটা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান, যখন ভারতের পেসার আর্শদিপ সিং তার দিকে বল ছুড়ে দেন।
শেষ পর্যন্ত ম্যাচের গল্পটা নির্ধারণ করে দুই দলের পাওয়ার-প্লে। নিউজিল্যান্ড যেখানে তিন উইকেটে ৫২ রান তুলেছিল, সেখানে ভারত বিনা উইকেটে করেছিল ৯২ রান। সেই পার্থক্যই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
ম্যাচ শেষে স্যান্টনার বলেন, ‘আমাদের জন্য দিনের গল্প ছিল পাওয়ার-প্লে। তারা যেখানে ৯০-এর বেশি রান করেছে, আমরা সেখানে দ্রুত উইকেট হারিয়েছি। ২৫০ রান তাড়া করতে গেলে সবকিছুই নিখুঁতভাবে করতে হয়।’
ফাইনালের আগে নিউজিল্যান্ডে দারুণ উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। অনেকেই আশা করেছিলেন এবার হয়তো দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে প্রথমবার সাদা বলের বিশ্ব শিরোপা জিতবে কিউইরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারতের দাপটের সামনে সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়।
প্রায় এক লাখ দর্শকের সামনে ভারতের হাসি আর নিউজিল্যান্ডের হতাশাই হয়ে থাকে এই ফাইনালের শেষ দৃশ্য।
এ জাতীয় আরো খবর..