✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-২৫, | ০১:৩৪:৫৩ |তালেবানের ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছর পূর্তিতে আফগানিস্তানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার ভেতরের রূপচিত্র তুলে এনেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। উত্তর থেকে দক্ষিণের বিভিন্ন প্রদেশ ঘুরে সাবেক আত্মঘাতী হামলাকারী, তালেবানের শীর্ষ স্থানীয় কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের মুখোমুখি হয়ে উঠে এসেছে নারী অধিকারের চরম সংকোচন, প্রকাশ্য গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ এবং প্রশাসনিক কঠোরতার এক বাস্তব ছবি।
জওজজান প্রদেশের গভর্নরের কার্যালয়ে একটি ঘটনা চোখে পড়ে। জওজজানের গভর্নর ও সাবেক তালেবান কমান্ডার আবদুল্লাহ সারহাদি তার কার্যালয়ে বসে এক যুবকের ভাঙা হাতের চিকিৎসার টাকা দেন এবং স্থানীয় মসজিদের জন্য অর্থ বরাদ্দ করেন। ঠিক সেই সময় এক তরুণী তার কক্ষে প্রবেশ করে বিচার চান।
আঠারো বছর বয়সী তরুণী তৌবা (ছদ্মনাম) পুরো মুখ ঢেকে রাখা নেকাব ও সানগ্লাস পরে গভর্নরকে শান্ত ও দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, তিনি তার স্বামীর মাসের পর মাস চালানো নির্যাতন ও প্রহার থেকে বাঁচতে তালাক চান। তৌবা বলেন, যদি একসঙ্গে থাকার কোনো সম্ভাবনা থাকত, তবে আমি এখানে আসতাম না... আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।
মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা নিষিদ্ধের দেশে এই তরুণী সরাসরি গভর্নরের সঙ্গে তর্ক চালান। কিন্তু গভর্নর সারহাদি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে বলেন, নিজেকে জিজ্ঞাসা করো, তোমার ডিভোর্সের পর তোমাকে কে বিয়ে করবে? তোমাকে অনেক ছাড় দিতে হবে, না হয় তুমি তোমার সম্মান ও মর্যাদা হারাবে।
তৌবা তাৎক্ষণিক উত্তর দেন, গভর্নর, আমার সম্মান ও মর্যাদা ইতিমধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে। তার স্বামী সে সময় নীরব শ্রোতা হিসেবে নিজের বক্তব্যের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল।
শরিয়াহ আইনের অধীনে, কোনো নারী বিবাহবিচ্ছেদের জন্য স্বামীর সম্মতি চাইলে বিয়ের দেনমোহর ফেরত দিতে হয়। তৌবার স্বামী তাদের বিয়ের সময় দেওয়া অর্থের চেয়ে চারগুণ বেশি দাবি করেন, যা মেয়েটির পরিবার পরিশোধে অস্বীকৃতি জানায়।
গভর্নর সারহাদি তরুণীকে পরামর্শ দেন যে, তাকে তার স্বামীর বাড়িতে একটি আলাদা কক্ষ দেওয়া হোক। এছাড়া কর্মকর্তারা তার স্বামীকে মারধর না করার নির্দেশ দিয়ে সতর্ক করবেন, অন্যথায় তাকে কারাগারে পাঠানো হবে।
এই বিচারে অসন্তুষ্ট হয়ে তৌবার বাবা জানান, তারা আদালতের মাধ্যমে তালাকের আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। যদিও তালেবানের বর্তমান আদালত ব্যবস্থায় স্বামীর সম্মতি ছাড়া কোনো নারীর পক্ষে তালাক পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
পরে নারীটি ঘর থেকে বের হয়ে গেলে উপস্থিত পুরুষ কর্মকর্তা, দেহরক্ষী ও প্রবীণদের হাসির মধ্যে গভর্নর সারহাদি মন্তব্য করেন, নারীরা বুদ্ধিহীন এবং বুদ্ধিতে ঘাটতিযুক্ত।
গভর্নর আবদুল্লাহ সারহাদি নব্বইয়ের দশকে তালেবানের প্রথম শাসনের সময় একজন সামরিক কমান্ডার ছিলেন এবং ২০০১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে আত্মসমর্পণ করে কয়েক বছর গুয়ান্তানামো বে-তে বন্দি ছিলেন।
স্মার্টফোনের আধুনিক যুগে তিনি নিজের পুরোনো ধাঁচের বাটন মোবাইলে বোতাম টিপতে টিপতে জানান, তালেবান কর্মকর্তাদের স্মার্টফোন ব্যবহারে সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রশাসনিক কাজ ধীরগতির হয়ে পড়েছে। সারহাদি বলেন, আগে আপনি একটি দ্রুত বার্তা পাঠাতে পারতেন... দ্রুত নথি পাঠাতে এবং উত্তর পেতে পারতেন। এই বিষয়ে বেশি কথা বললে সমস্যা হবে বলেও জানান তিনি।
তবে প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে তার মনোভাব আগের মতোই চরমপন্থী রয়ে গেছে। বামিয়ানের বিখ্যাত বুদ্ধ মূর্তি ধ্বংসের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে গভর্নর সারহাদি বলেন, আমি নিজের হাতে এটি ধ্বংস করেছি।
তিনি আরও বলেন, আমরা যা করেছি এবং যা করি তা আল্লাহর নির্দেশ ও আইন অনুসারে... আমরা মূর্তি বিক্রির বদলে সেগুলো চূর্ণবিচূর্ণ করি। আমি কেন অনুশোচনা করব? এটা আল্লাহর ইচ্ছা ছিল।
রাজধানী কাবুলে তালেবানের আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ বদর একটি সাঁজোয়া গাড়ি চালিয়ে শহরের বিভিন্ন রাস্তা ঘুরিয়ে দেখান। বদর জানান, অতীতে তিনি কাবুলে আত্মঘাতী হামলাকারীদের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি সব রাস্তা ও গলি খুব ভালো করেই চিনি... কাবুল ও তার গলিগুলো সম্পর্কে আমাদের সব তথ্য ছিল। এমন কিছু এলাকা ছিল যেগুলোর পরিকল্পনায় দীর্ঘ সময় লেগেছে।
বিগত সময়ে সাধারণ মানুষ নিহত হওয়ার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বদর বিষায়কটি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, তালেবানরা মূলত মার্কিন কনভয়গুলোকে নিশানা করত এবং বেসামরিক লোকদের বিদেশি ঘাঁটি থেকে দূরে থাকার অনুরোধ করা হয়েছিল। তিনি আরও জানান, অতীত নিয়ে বেশি কথা বললে মানুষের কষ্ট বাড়বে এবং পুরোনো ক্ষত আবার ভেসে উঠবে।
হাবিবুল্লাহ বদর বর্তমানে কারাবন্দি বিষয়ক বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা এবং যিনি একসময় পদচ্যুত সরকারের সময়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি হিসেবে যে কারাগারে ছিলেন, পরবর্তীতে তিনি সেই কারাগারেরই উপ-প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
একটি উপজাতীয় সমাবেশে এক জনহিতৈষী ব্যক্তি বদরকে মেডেল দিয়ে সম্মানিত করার পর প্রকাশ্যে মেয়েদের স্কুল খোলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, শিক্ষালাভ করা ইসলামে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই ফরজ। এই মন্তব্যের পরপরই ওই বক্তার হাত থেকে দ্রুত মাইক্রোফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং সভা স্তব্ধ হয়ে যায়।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। বিবিসি তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদের কাছে এসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলে। মুজাহিদ এ সময় প্রথমবারের মতো নিজের আসল নাম তাহির শাহ সিদ্দিকী প্রকাশ করেন।
আমেরিকার অর্থায়নে নির্মিত বিলাসবহুল প্রেস সেন্টারে বসে মুজাহিদকে প্রশ্ন করা হয়, ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার সময় তারা নারীদের কাজ ও শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা কেন রাখা হয়নি।
জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ উত্তর দেন, আমরা শরিয়াহর কাঠামোর মধ্যে নারীদের অধিকার এবং বাকস্বাধীনতায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের সবকিছুকে শরিয়াহর চশমা দিয়ে দেখতে হবে। তিনি দাবি করেন, অফিসগুলোতে নারীদের কাজ করতে দিলে সেখানে অনৈতিকতা ছড়াবে এবং তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে।
দক্ষিণাঞ্চলীয় কান্দাহার শহরকে বর্তমানে তালেবানের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখা হয়। সেখানে পুরুষদের জন্য দাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, রেডিওতে গান বাজানো ও নারীর কণ্ঠ সম্প্রচার নিষিদ্ধ এবং রাস্তায় চিত্রগ্রহণে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
শহরের বাইরে পাহাড়ে সাবেক তালেবান যোদ্ধারা তাদের পুরোনো গোপন গুহা দেখান, যেখান থেকে তারা যুদ্ধের পরিচালনা করতেন। তালেবানের বিশ্বস্ত সাবেক যোদ্ধা আবিদ লালাই দেখান কীভাবে তারা গুহার ভেতর কোরআন শরিফ ও একে-৪৭ রাইফেল ঝুলিয়ে রাখতেন এবং লড়াই চালাতেন।
তবে তালেবানের এই দ্বিতীয় দফার শাসনের পাঁচ বছর পরেও আফগানিস্তানে তীব্র দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকট কাটেনি। সাধারণ আফগানদের তিন-চতুর্থাংশই মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
প্রতিবাদের অপরাধে নারীদের জেল খাটার খবর উঠে এসেছে। কাবুলের প্রতিবাদী নারী হোদা (ছদ্মনাম) বলেন, জীবন সম্পর্কে যাদের কোনো ধারণাই নেই, তারা কীভাবে হঠাৎ ক্ষমতায় এসে গেল ভেবে আমি বাকরুদ্ধ। আমি মনে করি তালেবানরা শিক্ষিত নারীদের ভয় পায়। সে কারণেই তারা নারীদের প্রতি বিধিনিষেধ আরোপ করে।