দীর্ঘদিন দেশের মৎস্য খাত মূলত অভ্যন্তরীণ জলাশয়কেন্দ্রিক থাকলেও এখন নজর দেওয়া হচ্ছে সমুদ্রভিত্তিক উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির দিকে। বিশেষ করে মেরিকালচার, সিফুড প্রসেসিং ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ আকর্ষণে একগুচ্ছ উদ্যোগ সামনে আনছে সরকার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ব্লু ইকোনমি দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) মৎস্য খাতের অবদান প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে প্রায় ২২ শতাংশ। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বের শীর্ষ অভ্যন্তরীণ মৎস্য ও অ্যাকুয়াকালচার উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি। তবে এখন লক্ষ্য শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয় বরং উচ্চমূল্যের সামুদ্রিক প্রজাতি, প্রযুক্তিনির্ভর চাষ এবং রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলা।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার সামুদ্রিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য আটটি অগ্রাধিকার প্রকল্প নির্ধারণ করেছে। এগুলো হলো- মেরিন ফিশ হ্যাচারি (সামুদ্রিক মাছের পোনা উৎপাদন কেন্দ্র), অফশোর কেজ ফার্মিং (উপকূলের বাইরে সমুদ্রে খাঁচা পদ্ধতিতে মাছ চাষ), বাণিজ্যিক সি-উইড (শৈবাল) খামার, আধুনিক ল্যান্ডিং সেন্টার (মৎস্য অবতরণ ও সংগ্রহ কেন্দ্র), সিফুড প্রসেসিং পার্ক (সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প পার্ক), কোল্ড-চেইন ও রেফ্রিজারেটেড লজিস্টিকস (হিমায়িত পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা), ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম (উৎস ও সরবরাহ শৃঙ্খল অনুসরণ ব্যবস্থা) এবং অ্যাকুয়াকালচার প্রযুক্তি ও অটোমেশন (মৎস্য ও জলজ চাষে আধুনিক প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয়করণ)।
মৎস্য অধিদপ্তরের ব্লু ইকোনমি বিভাগের উপপরিচালক ড. মুহাম্মদ তানভীর হোসেন চৌধুরী জানান, এই আটটি প্রকল্প পরস্পরের পরিপূরক। হ্যাচারিতে উন্নতমানের পোনা উৎপাদন হবে, অফশোর কেজ ফার্মিংয়ে বাণিজ্যিকভাবে সামুদ্রিক মাছ চাষ করা যাবে, সি-উইড ও অন্যান্য সামুদ্রিক সম্পদের উৎপাদন বাড়বে। আধুনিক ল্যান্ডিং সেন্টার মাছের গুণগত মান রক্ষা করবে, আর সিফুড প্রসেসিং পার্ক ও কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য প্রস্তুত ও সংরক্ষণে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ও অটোমেশন উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও গ্রহণযোগ্য করে তুলবে।
বিনিয়োগের সুযোগ শুধু উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্যিক খামার, হ্যাচারি, মাছের খাদ্য উৎপাদন, খামারের সরঞ্জাম, কোল্ড চেইন, প্রসেসিং, প্যাকেজিং, লজিস্টিকস, স্মার্ট মনিটরিং, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি এবং পরিবেশ পর্যবেক্ষণ- পুরো মূল্যশৃঙ্খলজুড়েই বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় কয়েকটি এলাকাকে মেরিকালচারের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কক্সবাজার-টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, মহেশখালী-সোনাদিয়া, কুতুবদিয়া, সন্দ্বীপ-নোয়াখালী উপকূল এবং খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলে সামুদ্রিক মাছ, সি-উইড, ঝিনুক ও কাঁকড়া চাষ সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
এদিকে ইতোমধ্যে সামুদ্রিক মাছ, সি-উইড, শেলফিশ ও কাঁকড়া চাষে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ সফল হয়েছে। পাশাপাশি নতুন প্রজাতি নির্বাচন, হ্যাচারি উন্নয়ন, স্মার্ট অ্যাকুয়াকালচার এবং আইওটি-ভিত্তিক খামার ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণাও এগিয়ে চলছে। ফলে এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, চীন, মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সিফুডের বড় সম্ভাবনাময় বাজার। দেশে ইতোমধ্যে প্রসেসিং প্ল্যান্ট, কোল্ড স্টোরেজ, বন্দর, সড়ক যোগাযোগ, মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক রপ্তানি সনদ প্রদানের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, যা নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। এ খাতকে আরও এগিয়ে নিতে জাতীয় মৎস্যনীতি ২০২৬, মেরিন ফিশারিজ আইন ২০২০, মেরিন ফিশারিজ রুলস ২০২৩, ২০২৬-২০৩৫ সময়ের কৌশলগত পরিকল্পনা, মেরিন স্পেশাল প্ল্যানিং (এমএসপি), সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং জলবায়ু-সহনশীল ব্লু ইকোনমিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ জাতীয় আরো খবর..