✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-০২, | ২৩:২৫:০২ |ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ছয় মাসের সামরিক অভিযান চালিয়েও ঘোষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র—এমন তথ্য উঠে এসেছে মার্কিন সংবাদপত্র দ্য নিউইয়র্ক টাইমস–এর এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, সামরিক সক্ষমতায় এগিয়ে থাকলেও তেহরানের নীতি কিংবা আচরণে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারেনি ওয়াশিংটন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থাকে দেশটির মিত্ররা ক্রমেই একটি কৌশলগত ব্যর্থতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
শুক্রবার প্রকাশিত ওই বিশ্লেষণে সাবেক কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতামত তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদের ওপর চাপ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের। এই পরিস্থিতি রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির কাছে ওয়াশিংটনের সীমাবদ্ধতার বার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, চলমান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সীমা স্পষ্ট করেছে এবং একই সঙ্গে মিত্র দেশগুলোর মধ্যে ওয়াশিংটনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। সামরিক চাপের মধ্যেও ইরান আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালিকে এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সক্ষমতা বজায় রেখেছে।
প্রতিবেদনে হরমুজ প্রণালিকে ইরানের অন্যতম বড় কৌশলগত সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নিয়ে ইরান ও ওমানের আলোচনাকে বর্তমান সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যু হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজের নিয়ন্ত্রণে তৃতীয় কোনো পক্ষের অংশগ্রহণের বিরোধিতা করছে তেহরান। ফলে ভবিষ্যৎ আলোচনায় প্রণালিটি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। একই সঙ্গে দেশটি হরমুজ প্রণালির ওপর কার্যকর প্রভাবও ধরে রেখেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল—উভয় দেশই তুলনামূলকভাবে কঠিন অবস্থানে পড়েছে এবং পরিস্থিতির জন্য একে অপরকে দায়ী করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার একটি উৎস হিসেবে দেখার প্রবণতাও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি মিত্র দেশের মধ্যে ওয়াশিংটনের নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলেও একই সময়ে ইরান, ইউরোপ, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও জোরদারের চেষ্টা করছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ মনে করছে, চলমান সংঘাত তাদের নিজস্ব নিরাপত্তাকেও প্রভাবিত করছে। তাই তারা বিকল্প কূটনৈতিক ভারসাম্য তৈরির পথ খুঁজছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘায়িত যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যেও কৌশলগত মতপার্থক্য বেড়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো সমঝোতার স্থায়িত্ব নিয়েও ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্রদের উদ্বেগের বিষয়টিও উঠে এসেছে। ট্রাম্পের পূর্ববর্তী পররাষ্ট্রনীতি, ন্যাটো নিয়ে অবস্থান এবং গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে তার মন্তব্য ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের সাবেক পরিচালক রবিন নিবলেটের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত যুদ্ধের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ব্যর্থতার চিত্রই তুলে ধরছে। তার মতে, এর ফলে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর মিত্রদের আস্থা দুর্বল হতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এলেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ সহজে কাটবে না।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস–এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সংঘাতের প্রভাব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আন্তর্জাতিক পরিসরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষই দ্রুত নির্ণায়ক সাফল্যের কাছাকাছি নয়। ফলে যুদ্ধবিরতি ও নতুন করে উত্তেজনা—এ দুইয়ের পুনরাবৃত্তিতে সংঘাতটি দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে।