✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-০২, | ১৬:০৫:৪২ |পুষ্টির অন্যতম উৎস হিসেবে প্রতিদিন যে দুধের ওপর নির্ভর করেন ভোক্তারা, সেই দুধই যদি হয় রাসায়নিক মিশ্রিত নকল- তাহলে এর চেয়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি আর কী হতে পারে।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় এমনই এক ভয়ংকর প্রতারণার ঘটনা সামনে এসেছে। যেখানে গরুর দুধের আদলে তৈরি করা হচ্ছে কৃত্রিম দুধ, যা পৌঁছে যাচ্ছে বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, কারখানা ও মিষ্টির দোকানে। সম্প্রতি বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব চিত্র ফুটে উঠে।
সোডা, তেল আর চিনি দিয়ে তৈরি ‘দুধ’
উল্লাপাড়ায় একটি অসাধু চক্র সয়াবিন তেল, সোডা, চিনি, লবণ ও পানি ব্যবহার করে তৈরি করছে নকল দুধ। সামান্য পরিমাণ আসল দুধের সঙ্গে এসব উপাদান মিশিয়ে ব্লেন্ড করার পর তৈরি করা হচ্ছে দুধের মতো দেখতে তরল পদার্থ। সাধারণভাবে দেখলে এই নকল দুধ বোঝার উপায় নেই। এমনকি দুধের ঘনত্ব ও ফ্যাটের মাত্রা ঠিক রাখতে এতে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানও মেশানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফ্যাট বাড়াতে মেশানো হচ্ছে রাসায়নিক
নকল দুধকে আসল হিসেবে উপস্থাপন করতে ভেজালকারীরা বিশেষ কৌশল ব্যবহার করছে। ফ্যাটের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য চিনি ও রাসায়নিক উপাদান যোগ করা হচ্ছে। পরে মেশিনে ভালোভাবে ব্লেন্ড করে তৈরি করা হচ্ছে কথিত ‘খাঁটি’ দুধ। অভিযোগ রয়েছে, এসব দুধ সাধারণ পরীক্ষায় সহজে শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে এই কারবার চালিয়ে যাচ্ছে চক্রটি।
কারখানা ও বাজারে সরবরাহের অভিযোগ
সিরাজগঞ্জ দেশের অন্যতম বড় দুধ উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে পরিচিত। অথচ এই অঞ্চলের নাম ব্যবহার করেই তৈরি করা হচ্ছে ভেজাল দুধ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব নকল দুধ বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্য তৈরির কারখানা ও মিষ্টির দোকানে সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া সিরাজগঞ্জের খোলা বাজারের দুধের হাটেও এসব ভেজাল দুধ বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরীক্ষায় ধরা না পড়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়
ভেজাল চক্রের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান- সাধারণ পরীক্ষায় যাতে ধরা না পড়ে, সেজন্য তারা দুধে বিভিন্ন উপাদান মেশানোর কৌশল ব্যবহার করেন। রাসায়নিক ব্যবহারের মাধ্যমে ফ্যাটের মাত্রা স্বাভাবিক রাখা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
ক্ষতিগ্রস্ত আসল খামারিরাও
ভেজাল দুধের কারণে শুধু ভোক্তারাই নয়, ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রকৃত খামারিরাও। তাদের অভিযোগ, বাজারে নকল দুধ ছড়িয়ে পড়ায় আসল দুধ উৎপাদনকারীরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি
উল্লাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মনোয়ার হোসেন জানান, সোডা, লবণ ও তেল মেশানো দুধ দীর্ঘদিন খেলে কিডনি, লিভার ও হজমজনিত নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, এ ধরনের ভেজাল খাবার শিশু ও বয়স্কদের জন্য আরও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে।
ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রশাসনের
এদিকে ভেজাল দুধ উৎপাদন ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রায়হানুল ইসলাম। গণমাধ্যমকে তিনি জানান, ভেজাল চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কী বলছেন খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা
চিকিৎসকদের মতে- সোডা, অতিরিক্ত লবণ, তেল ও অন্যান্য রাসায়নিক মিশ্রিত দুধ দীর্ঘমেয়াদে কিডনি, লিভার ও পরিপাকতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে। এছাড়া কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিকের কারণে ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ভেজাল দুধ উৎপাদন ও বাজারজাতের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে বাজার তদারকি জোরদার এবং নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে ভোক্তাদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সূত্র : দেশটিভি।