✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-২৮, | ২২:০৫:০৪ |একসময় নির্বিচারে শিকার হতো সুন্দরবনের বাঘ। একশ্রেণির শিকারি প্রকাশ্যে বন্দুক নিয়ে দল বেঁধে বনে ঢুকত। রয়েল বেঙ্গল টাইগার শিকার করে বীরের বেশে ফিরতেন তারা। তখন বাঘ সংরক্ষণে কার্যকর কোনো আইন ছিল না। মানুষের মধ্যেও ছিল না বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনতা। ফলে বনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা ও বনজীবীদের অনেকেই বাঘকে নিজেদের শত্রু মনে করতেন।
তবে বর্তমানে প্রকাশ্যে শিকার না হলেও চোরাপথে বাঘ শিকার ও পাচারের অভিযোগ এখনো রয়েছে।
স্বাধীনতার পর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে প্রথম বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয় ১৯৭৩ সালে। ওই বছর বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আদেশ জারির মাধ্যমে সুন্দরবনে বাঘ শিকার আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন সংশোধন করে বাঘ শিকার, হত্যা, পাচার ও অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির বিধান করা হয়। এর ফলে বন বিভাগ আইনি ভিত্তিতে আরও কার্যকরভাবে বাঘ সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। তবে আইন কঠোর হওয়ার পরও সুন্দরবনে বাঘ হত্যা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
বন বিভাগ জানায়, বহু বছর ধরে মানুষ ও বাঘের দ্বন্দ্ব চলছে। খাদ্যের সন্ধানে বা প্রাকৃতিক নানা কারণে বাঘ লোকালয়ে ঢুকে পড়লে অনেক ক্ষেত্রে গ্রামবাসী দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে বাঘ হত্যা করত। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সর্বশেষ শুমারিতে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৫টি। এর আগে ২০১৪ সালের শুমারিতে ছিল ১০৬টি এবং ২০১৮ সালের শুমারিতে ছিল ১১৪টি।
এই সময়ের মধ্যে গত প্রায় আড়াই দশকে পূর্ব সুন্দরবনে ৩০টিসহ অন্তত ৯১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চোরাশিকারি ও পাচারকারীদের হাতে নিহত হয়েছে ২৬টি। গ্রামবাসীর পিটুনিতে মারা গেছে ১৪টি। বনদস্যুদের হাতে প্রাণ গেছে ১৮টি। বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছে ২১টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা গেছে ৩টি বাঘ। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে উদ্ধার হওয়া বাঘের চামড়ার ঘটনাগুলো থেকে আরও বাঘ হত্যা ও পাচারের ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়। তবে এসব ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য বন বিভাগের কাছে সংরক্ষিত নেই।
অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪২৫ জন বনজীবী।
বন বিভাগের তথ্যমতে, আগের সেই পরিস্থিতির অনেকটাই বদলে গেছে। আইনের কঠোর প্রয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট পেট্রোলিং, টহল ও নজরদারি বৃদ্ধি, ড্রোন ও ক্যামেরা ট্র্যাপের ব্যবহার, বনজীবীদের সচেতনতা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে বাঘ-মানুষের সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এর ফলেই ২০২৪ সালের পর থেকে সুন্দরবনে একটি বাঘও হত্যা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে শিকারিদের পাতা ছিটকা ফাঁদে আটকা পড়ে একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনী। পরে বন বিভাগ সেটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেয়। সেখানে ছয় মাস চিকিৎসার পর বাঘিনীটি সুস্থ হয়ে ওঠে। এরপর ১২ জুলাই তাকে আবারও সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়। বাঘিনীর চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য বনের প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকায় বসানো হয়েছে স্বয়ংক্রিয় ২০টি ক্যামেরা। ঘটনাটিকে সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিবেশ সংগঠন ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’র প্রধান সমন্বয়কারী নূর আলম শেখ বলেন, সুন্দরবনের বাঘ শুধু একটি প্রাণী নয়, এটি পুরো ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের প্রধান শিকারি। বাঘ টিকে থাকলে বন টিকে থাকবে, নিরাপদ থাকবে উপকূলও।
তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর লবণাক্ততা বৃদ্ধি, চোরাশিকার, বন ধ্বংস এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে আবারও বাঘ সংকটে পড়তে পারে। তাই বাঘ সংরক্ষণ কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার বিকল্প নেই।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, বন অপরাধ দমন এবং স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে বাঘ-মানুষের সংঘাত কমেছে। আহত বাঘ উদ্ধার ও চিকিৎসার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক সাফল্য এসেছে। আমাদের লক্ষ্য সুন্দরবনের বাঘকে নিরাপদ রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা।
বাঘ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ বলেন, শুধু আইন করলেই হবে না, বাঘ রক্ষা করতে হলে আগে হরিণ রক্ষা করতে হবে। কারণ হরিণই বাঘের প্রধান খাদ্যপ্রাণী। হরিণের সংখ্যা কমে গেলে সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়বে। তাই চোরাশিকার দমন করা জরুরি। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাঘের নিরাপদ আবাসস্থলও হুমকির মুখে পড়ছে। এ কারণে বাঘ সংরক্ষণে সমন্বিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে।