✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-২৬, | ১১:১৪:৫৫ |নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস বিতর্ককে কেন্দ্র করে টানা এক মাসের আন্দোলনের মুখে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং আন্দোলনকারীদের মূল দাবিগুলো সরকার মেনে নেওয়ার পরপরই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন গুঞ্জন তৈরি হয়েছে। ভারতের রাজনীতিতে সরাসরি ভোটের মাঠে দেখা যাবে কি সিজেপিকে, নাকি আড়ালে থেকেই কলকাঠি নাড়বে—অতিসম্প্রতি এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন প্ল্যাটফর্মটির দুজন শীর্ষ নেতা।
তরুণদের নেতৃত্বাধীন বিদ্রূপাত্মক রাজনৈতিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এখনই কোনো পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। তবে ভবিষ্যতে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যোগ দেবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সংগঠনটির অন্যতম শীর্ষ নেতা ও মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ভারতে কোনো বিষয়কেই কখনোই চূড়ান্ত ‘না’ বলা যায় না। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা এবং সৌরভ দাস আন্দোলন-পরবর্তী পরিকল্পনা ও তাদের ভবিষ্যৎ রাজনীতির রূপরেখা স্পষ্ট করেছেন।
টানা আন্দোলনের সাফল্য অর্জনের পর নিজের অনুভূতি ও পরবর্তী পরিকল্পনা জানাতে গিয়ে সিজেপি মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, এখন আমার একমাত্র চিন্তা হলো বাড়ি ফিরে ঘুমোনো, কিছুটা বিশ্রাম নেওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করা। গত দু’মাস ধরে আমি বাড়ির বাইরে আছি এবং আমি সত্যিই এখন একটু শান্ত হতে চাই, গত দু’মাসে যা কিছু ঘটেছে তা নিয়ে একটু ভেবে দেখতে চাই। আমার মনে হয় পুরো বিষয়টিই আমাদের সবার জন্য বেশ আবেগঘন। এটি যেমন গর্বের মুহূর্ত, তেমনি সত্যিই অত্যন্ত আনন্দের এবং স্বস্তির একটি সময়। আর এর পর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা আমরা ভেবে দেখব।
তবে ভবিষ্যতে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন কি না—এমন সরাসরি প্রশ্নে রাঙ্কা বলেন, ভারতে কোনো বিষয়কেই কখনোই ‘না’ বলতে নেই বলে আমি মনে করি।
অন্যদিকে, সিজেপির অপর মুখপাত্র সৌরভ দাস স্পষ্ট করেছেন যে এই মুহূর্তে সরাসরি রাজনীতিতে নামা তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। আন্দোলনকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়াই তাদের প্রাথমিক অগ্রাধিকার। সৌরভ দাস বলেন, বর্তমানে আমাদের লক্ষ্য অত্যন্ত পরিষ্কার, এই আন্দোলনকে একদম তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। কারণ দেশে ইতিমধ্যেই সাড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ রাজনৈতিক দল রয়েছে, কিন্তু তাদের কেউই তরুণদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারছে না। আমরা এই আন্দোলনকে তৃণমূল স্তরে এমনভাবে পৌঁছে দিতে চাই যাতে ক্ষমতায় থাকা যেকোনো রাজনৈতিক দল বা নেতাই তরুণদের জন্য কাজ করতে এবং তাদের দাবি পূরণ করতে বাধ্য হন। আপাতত এটাই আমাদের প্রধান অ্যাজেন্ডা।
ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দিনই সিজেপি নেতাদের এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য সামনে এলো। নিট প্রশ্নফাঁস কাণ্ড নিয়ে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা টানা ছাত্র আন্দোলনের পর পদত্যাগপত্র জমা দেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। নিজের পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন যে, গত ১০ দিনের ঘটনাবলি তাকে গভীরভাবে ‘ব্যথিত’ করেছে এবং এই বিষয়টি কোনোভাবেই তার ‘ব্যক্তিগত মর্যাদার বিষয় নয়’। একই সঙ্গে তিনি জানান, এই স্পর্শকাতর পরিস্থিতিকে কোনো ‘রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি’ যেন কাজে লাগাতে না পারে এবং দেশের ঐক্য যেন বজায় থাকে, তা নিশ্চিত করতেই তিনি সরে দাঁড়িয়েছেন। এ ছাড়া একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎও যাতে আইনি জটিলতায় জড়িয়ে না পড়ে এবং শিক্ষার্থীরা যেন পুনরায় পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে পারেন, সেই বিষয়টিকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির টানা দীর্ঘ শাসনকালে কোনো বড় ধরনের গণবিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করা দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। এর আগে ২০১৮ সালে ‘মি টু’ (#MeToo) আন্দোলনে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠার পর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর পদত্যাগ করেছিলেন। গত ২০ জুন দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির অনির্দিষ্টকালের অবস্থানের মাধ্যমে যে গণ-আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মাধ্যমে সরকারের নীতিতে এক বিরাট পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটল।
আম আদমি পার্টির (আপ) সাবেক কর্মী অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে মে মাসে একটি বিদ্রূপাত্মক অনলাইন ক্যাম্পেইন হিসেবে শুরু হওয়া এই আন্দোলনটি পরবর্তীতে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যতম সর্ববৃহৎ যুব বিক্ষোভে রূপ নেয়। গত ২০ জুলাই সরকার প্রথমবার সিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। আন্দোলনের সঙ্গে পরিবেশকর্মী সোনাম ওয়াংচুক যুক্ত হওয়ার পর এই প্রতিবাদ আরও গতি পায় এবং তিনি টানা ২৬ দিন অনশনের পর গত বৃহস্পতিবার তা ভঙ্গ করেন। এরপর আন্দোলনকারীদের দাবিতে আলোচনার স্থান মন্ত্রীর বাসভবন থেকে সরিয়ে নিরপেক্ষ স্থান হিসেবে ‘কনস্টিটিউশন ক্লাব অব ইন্ডিয়া’-তে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে কেন্দ্রীয় বিজেপি সভাপতি জে পি নাড্ডা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংহের সঙ্গে সিজেপি নেতাদের চূড়ান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
চূড়ান্ত বৈঠকের পরিবেশ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আশুতোষ রাঙ্কা জানান, আগের আলোচনাগুলোর তুলনায় শনিবারের বৈঠকের আবহ ছিল বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ। তাদের পৌঁছানোর আগেই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ হয়ে গিয়েছিল জানিয়ে রাঙ্কা বলেন, আজকের বৈঠকটি বেশ আন্তরিক ছিল। আমার মনে হয় আমরা পৌঁছানোর আগেই পদত্যাগের বিষয়টি ঘটে যায়। আলোচনা মূলত বাকি দুটি দাবিকে কেন্দ্র করেই হয়েছিল। খুব দ্রুতই সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয় এবং আমরা সবাই মিলে এই সুন্দর সমাপ্তির সিদ্ধান্ত নিই। আমাদের চাওয়া অনুযায়ী যেভাবে সরকার দাবিগুলো মেনে নিয়েছে, সেই পদক্ষেপকে আমরা সত্যিই সাধুবাদ জানাই।
আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহারের প্রসঙ্গে রাঙ্কা জানান, সরকার সব আন্দোলনকারী ও আয়োজকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা এফআইআর তুলে নিতে এবং ভবিষ্যতে নতুন কোনো মামলা না করার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। একজন উগ্র অপরাধী এবং সাধারণ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীর মধ্যে পার্থক্য যে কেউ বুঝতে পারবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সিজেপি প্রথম দিন থেকেই অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পক্ষে সওয়াল করে এসেছে এবং গত ৩৭ দিনে আমরা ঠিক সেটাই অর্জন করেছি। সমঝোতা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং খুব শিগগিরই লিখিত চুক্তিও সামনে আসবে। চুক্তিটি মূলত সমস্ত আন্দোলনকারী ও আয়োজকদের ওপর থেকে এফআইআর প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে সিজেপির কর্মী-সমর্থকদের ওপর নতুন করে এফআইআর না দেওয়ার ওপর ভিত্তি করেই হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দাবি মানতে কেন পুরো এক মাস সময় লাগল—এমন প্রশ্নের জবাবে রাঙ্কা বলেন, এটি আন্দোলনকারীদের নয় বরং সরকারের কাছেই রাখা উচিত। তিনি জানান, তারা বিজেপি সভাপতি জে পি নাড্ডাকেও একই প্রশ্ন করেছিলেন যে শিক্ষার্থীদের ৩০ দিন ধরে রাস্তায় বসে থাকার পর কেন সরকারের এ বিষয়ে সাড়া মিলল, যা অনেক আগেই করা উচিত ছিল। রাঙ্কা আরও যোগ করেন, আমরা সবাই শিক্ষিত মানুষ, পেশাদার আন্দোলনকারী নই। আমরা সবাই পেশাগত কাজ করতাম, রাজনীতির সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। দীপকে বোস্টনে পড়াশোনা করছিল, আন্দোলন শেষ হলে হয়তো সে নিজের জন্য চাকরির খোঁজ শুরু করত।
পদত্যাগপত্রে শিক্ষামন্ত্রীর ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যের জবাবে রাঙ্কা আশা প্রকাশ করেন যে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আর ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বা ‘ভাইরাস’ হিসেবে দেখবে না সরকার। তিনি বলেন, আমি পেছনের খুচরো বিতর্কে যেতে চাই না, তবে আমি আশা করি তারা যেন আর আমাদের দেশবিরোধী বা ভাইরাস না বলেন, যা এতদিন ধরে আমাদের বলা হচ্ছিল। দিনশেষে আমার মনে হয়, আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি।