ফুটবল আসলে কার, ফিফা না রাজনীতির?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-১৯, | ২৩:৩৮:৪৩ |

গত ৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফোন করেছিলেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে। আলোচনার বিষয় ছিল বিশ্বকাপের একটি লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত। কেননা চলতি বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড় ফোলারিন বালোগুন লাল কার্ড দেখার পর পরবর্তী ম্যাচে নিষিদ্ধ হন। ট্রাম্প ইনফান্তিনোর কাছে সেই বিষয়েই অনুরোধ জানানোর জন্য ফোন করেন। যদিও এই ফোনের পরই সিদ্ধান্তটি যেন পুনর্বিবেচনা করা হয়। এরপর ফিফা সেই নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে।

ইউরোপের ফুটবল মহলে এ নিয়ে প্রতিবাদ শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত আর পরিবর্তন হয়নি।

ফুটবলের প্রায় দেড়শো বছরের ইতিহাসে রেফারির সিদ্ধান্তই ছিল মাঠের শেষ কথা। কিন্তু এবার সেই সিদ্ধান্তে একজন রাষ্ট্রপ্রধানের টেলিফোনের প্রভাব পড়েছে—এটাই নতুন বিতর্কের মূল বিষয়।

যে সংস্থা নিজেদের রাজনীতির ঊর্ধ্বে বলে দাবি করে, সেই ফিফাই একটি রাজনৈতিক ফোনকল গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ফুটবলের স্বাধীনতা আসলে কতটা অটুট আছে?

রোববার দিবাগত রাতে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ফাইনাল। তবে এই আলোচনা কোনো ম্যাচের পূর্বাভাস নয়। বরং বড় প্রশ্ন হলো—ফুটবল আসলে কার?

এই প্রশ্ন নতুন নয়। শত শত বছর ধরে ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই খেলা নিয়ন্ত্রণের লড়াই চলে আসছে। সেই দীর্ঘ ইতিহাস না বুঝলে বোঝা কঠিন, আজকের বিশ্বকাপে আসলে কী বিক্রি হচ্ছে এবং এর মূল্য কে দিচ্ছে।

বিশ্বকাপের মাঠের বাইরের সীমান্ত

বিশ্বকাপ শুরুর আগেই স্পষ্ট হয়ে যায়, শুধু মাঠের খেলা নয়—ইমিগ্রেশন নীতিও বড় ভূমিকা পালন করবে।

ইরানের অনেক দর্শক টিকিট কিনেছিলেন। কিন্তু আয়োজক দেশের সঙ্গে ইরানের রাজনৈতিক উত্তেজনার পর তাদের টিকিট বাতিল হয়ে যায়।

আফ্রিকার অন্যতম সেরা রেফারি, সোমালিয়ার ওমর আবদুলকাদির আরতান, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ভিসা নিয়ে মিয়ামি বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন। তাকে প্রায় ১১ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর ফেরত পাঠানো হয়।

পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, তিনি শুধু একজন রেফারি হিসেবে জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূরণ করতে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। তবে কেন তাকে এত দীর্ঘ সময় জেরা করা হলো, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া ফিলিস্তিন ফুটবল ফেডারেশনের প্রধানও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাননি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দর্শকদের সতর্ক করে বলেন, খেলা দেখে যেন তারা দেশে ফিরে যান। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার হুমকি দেন, তার অপছন্দের রাজনৈতিক অবস্থানের শহরগুলো থেকে ম্যাচ সরিয়ে নেওয়া হতে পারে।

নিয়ম অনুযায়ী এমন সিদ্ধান্তের ক্ষমতা ফিফার হাতে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো—ফিফা কতটা স্বাধীন? ৬ জুলাইয়ের সেই ফোনকলই এই প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

কেন ফুটবল এত গুরুত্বপূর্ণ?

জাতিসংঘের সদস্য দেশ ১৯৩টি। আর ফিফার সদস্য সংখ্যা ২১১টি। অর্থাৎ, বিশ্বের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সংগঠনের চেয়েও ফুটবলের সংগঠনে ১৮টি বেশি পতাকা ওড়ে।

যেসব জাতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পূর্ণ স্বীকৃতি পায়নি, ফুটবল তাদের অনেককেই পরিচয় ও অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়েছে। ফিলিস্তিন তার একটি উদাহরণ। জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য না হলেও ফিফার সদস্য হিসেবে তারা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অংশ নেয়।

গত বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখেছিল প্রায় ১৫০ কোটি মানুষ। পুরো টুর্নামেন্ট মিলিয়ে দর্শকের সংখ্যা ছাড়িয়েছিল ৫০০ কোটি।

মানবজাতির এত বড় অংশকে একই সময়ে একই দিকে তাকাতে বাধ্য করার মতো শক্তি পৃথিবীতে খুব কম কিছুর আছে।

তাই এত বড় জনসমাবেশের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—এটি কখনোই শুধু খেলার প্রশ্ন ছিল না। এটি সবসময়ই ছিল ক্ষমতার প্রশ্ন।

আর ইতিহাস বলছে, ক্ষমতাবানরা এই প্রশ্নটি অনেক আগেই বুঝে ফেলেছিল।

 

সূত্র : ব্রডশিট

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..